জোরপূর্বক শ্রম রোধে ব্যর্থতার অভিযোগ তুলে বাংলাদেশসহ বিশ্বের প্রায় ৬০টি বাণিজ্য অংশীদার দেশের ওপর নতুন করে শুল্ক আরোপ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। শুক্রবার থেকে কার্যকর হওয়া এই শুল্কের হার দেশভেদে ১০ থেকে ১২ দশমিক ৫ শতাংশ পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়েছে।
মার্কিন শুল্কের এই নতুন তালিকায় বাংলাদেশ ছাড়াও যুক্তরাজ্য, চীন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, কানাডা, জাপান, ভারত ও পাকিস্তানের মতো দেশগুলো রয়েছে। চলতি বছরের শুরুতে অস্থায়ীভাবে আরোপ করা ১০ শতাংশ করের মেয়াদ শেষ হওয়ার দিন থেকেই নতুন এই শুল্ক নীতি আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যকর করল ওয়াশিংটন।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার পর থেকে বৈশ্বিক বাণিজ্যে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, এটি তারই সর্বশেষ সংযোজন। এর আগে জরুরি ক্ষমতার আওতায় ট্রাম্প প্রশাসন বিশ্বজুড়ে যে বিপুল শুল্ক আরোপ করেছিল, চলতি বছরের শুরুতে মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট তা অবৈধ ঘোষণা করে। এরপর থেকেই ট্রাম্প তার বাণিজ্য নীতি বাস্তবায়নে বিকল্প আইনি পথের সন্ধান করছিলেন।
এরই ধারাবাহিকতায় মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধি জেমিসন গ্রিয়ার ১৯৭৪ সালের বাণিজ্য আইনের `সেকশন ৩০১` প্রয়োগ করে নতুন শুল্ক কার্যকরের ঘোষণা দেন। তার মতে, মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং বাণিজ্য বিকৃতির মতো বিষয়গুলো সংশোধন করে বিশ্বব্যাপী শ্রমিকদের কল্যাণ নিশ্চিত করতেই যুক্তরাষ্ট্রের এই কড়া পদক্ষেপ।
মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধির কার্যালয় জানিয়েছে, নতুন এই শুল্ক যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ ৬০টি বাণিজ্য অংশীদারের ওপর প্রযোজ্য হবে, যা দেশটির মোট আমদানির ৯৯ দশমিক ৪ শতাংশের সমতুল্য। তবে শুল্কের হারে কিছুটা পার্থক্য রাখা হয়েছে।
যেসব দেশ জোরপূর্বক শ্রম দিয়ে তৈরি পণ্যের আমদানি নিষিদ্ধ করার বিষয়ে এরই মধ্যে অঙ্গীকার করেছে বা কার্যকর পদক্ষেপ নিয়েছে, তাদের ওপর ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হয়েছে। এই ১০ শতাংশের তালিকায় রয়েছে বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, যুক্তরাজ্য, কানাডাসহ বেশ কয়েকটি দেশ। অন্যদিকে, যেসব দেশ এ বিষয়ে পর্যাপ্ত পদক্ষেপ নেয়নি বা প্রতিশ্রুতি দেয়নি, তাদের ওপর ১২ দশমিক ৫ শতাংশ উচ্চ হারের শুল্ক বসানো হয়েছে।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প দীর্ঘদিন ধরেই দাবি করে আসছেন, শুল্ক আরোপের ফলে মার্কিন শ্রমিকরা সুরক্ষিত হয় এবং দেশীয় অর্থনীতি চাঙ্গা হয়। তবে অর্থনীতিবিদরা এই যুক্তির সাথে একমত নন। তারা সতর্ক করে বলেছেন, এমন সিদ্ধান্তের ফলে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম ব্যাপকভাবে বেড়ে যাবে।
কারণ, আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো বাড়তি শুল্কের এই বিশাল বোঝা শেষ পর্যন্ত সাধারণ ক্রেতাদের পকেট থেকেই আদায় করবে। বিশ্লেষকদের মতে, মূলত শ্রম বিধিমালার আড়ালে অন্যান্য দেশের ওপর অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করতেই ট্রাম্প প্রশাসন এই শুল্ক নীতিকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে।
যুক্তরাষ্ট্রের এমন আকস্মিক সিদ্ধান্তে আন্তর্জাতিক মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে। নতুন করে ১২ দশমিক ৫ শতাংশ শুল্কের মুখে পড়া ব্রাজিল এই পদক্ষেপকে সম্পূর্ণ `অন্যায্য` ও `খামখেয়ালিপূর্ণ` আখ্যা দিয়েছে। দেশটির সরকারের মতে, নিজেদের সুরক্ষাবাদী বাণিজ্য নীতির স্বার্থে ওয়াশিংটন এখন শ্রমিকদের অধিকারের ইস্যুটিকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে।
অন্যদিকে, জাপান সরকার এই ঘটনায় গভীর দুঃখ প্রকাশ করে দাবি করেছে, তাদের বাণিজ্য বরাবরই আন্তর্জাতিক নিয়মের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এছাড়া অস্ট্রেলিয়ার বাণিজ্যমন্ত্রী ডন ফ্যারেল এই শুল্ক আরোপকে অযৌক্তিক উল্লেখ করে তা প্রত্যাহারের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ওপর চাপ অব্যাহত রাখার কড়া বার্তা দিয়েছেন। সূত্র:বিবিসি


আপনার মতামত লিখুন :