যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি ঐতিহাসিক পারমাণবিক সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষর করেছে সৌদি আরব। এই চুক্তির ফলে মধ্যপ্রাচ্যের রক্ষণশীল এই দেশটিতে বেসামরিক পারমাণবিক কর্মসূচি গড়ে তোলার এক বিশাল দ্বার উন্মোচিত হতে যাচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি মন্ত্রণালয় একে একটি `শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক সহযোগিতা চুক্তি` হিসেবে আখ্যা দিয়ে জানিয়েছে, এর ফলে সৌদি আরবের পারমাণবিক জ্বালানি কর্মসূচিতে মার্কিন কোম্পানিগুলোর জন্য শত শত কোটি ডলারের ব্যবসার এক অভূতপূর্ব সুযোগ সৃষ্টি হবে।
এর পাশাপাশি একটি `দ্বিপক্ষীয় সুরক্ষা চুক্তি`ও স্বাক্ষরিত হয়েছে, যা পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধসহ উভয় দেশের অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত অর্থনৈতিক ও কৌশলগত লক্ষ্যগুলোকে আইনি ভিত্তি দেবে বলে দাবি করা হচ্ছে।
গত নভেম্বরে সৌদি নেতার ওয়াশিংটন সফরের ধারাবাহিকতায় সম্পন্ন হওয়া এই চুক্তিকে দুই দেশের বিদ্যমান জ্বালানি খাতের সহযোগিতারই এক নতুন সম্প্রসারণ বলে উল্লেখ করেছে রিয়াদ।
এমন এক সময়ে এই চুক্তির ঘোষণা এলো, যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সামরিক উত্তেজনা চরম আকার ধারণ করেছে এবং ইয়েমেনে ইরানের মিত্র হুথি বিদ্রোহীরা সৌদি আরবের বিরুদ্ধে নৌ-পথ অবরোধের ঘোষণা দিয়েছে।
চুক্তির বিস্তারিত শর্ত এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ না করা হলেও বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের ইঙ্গিত অনুযায়ী, যৌথ পর্যালোচনার পর সৌদি আরবকে তাদের নিজস্ব ভূখণ্ডেই ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার অনুমতি দেওয়া হতে পারে। আর এটিই বিশ্লেষক ও বিশেষজ্ঞদের সবচেয়ে বড় উদ্বেগের কারণ।
ডিফেন্স প্রায়োরিটিজ-এর মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক পরিচালক রোজমেরি কেলানিকের মতে, এটি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি নজিরবিহীন পদক্ষেপ, কারণ দেশটি এর আগে কখনোই অন্য কোনো দেশকে তাদের নিজস্ব মাটিতে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার সুযোগ দেয়নি।
ইউরেনিয়াম যেমন বিদ্যুৎকেন্দ্রের জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত হয়, তেমনি এটি পারমাণবিক বোমা তৈরিরও প্রধান উপাদান। নিজস্ব প্রযুক্তিতে জ্বালানি তৈরির সক্ষমতা অর্জন করলে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির ঝুঁকিও বহুগুণ বেড়ে যায়।
স্বভাবতই এই চুক্তি মার্কিন কংগ্রেসের উভয় কক্ষে তীব্র বিতর্কের জন্ম দেবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। যদিও বর্তমানে কংগ্রেস প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টির নিয়ন্ত্রণাধীন, তবুও উভয় দলের আইনপ্রণেতাদের তরফ থেকেই বিরোধিতার আশঙ্কা রয়েছে।
বিশেষ করে পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর ভূমিকা নিয়ে তীব্র সমালোচনা শুরু হয়েছে ডেমোক্র্যাট শিবিরে। ফিলিপাইন সফরে গিয়ে রুবিও দাবি করেছেন যে, পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তারের ঝুঁকি তৈরি করে এমন কোনো দেশের সঙ্গেই যুক্তরাষ্ট্র চুক্তি করবে না। অথচ সিনেটর থাকাকালে এই রুবিও নিজেই `নো নিউক্লিয়ার ওয়েপনস ফর সৌদি অ্যারাবিয়া অ্যাক্ট`-এর জোরালো সমর্থক ছিলেন।
ডেমোক্র্যাটিক সিনেটর এডওয়ার্ড মার্কে ট্রাম্প ও রুবিওর কড়া সমালোচনা করে বলেছেন, একদিকে ইরানকে পারমাণবিক বোমা বানানো থেকে আটকাতে যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ করছে, অন্যদিকে সৌদি আরবের মতো একটি দেশকে পারমাণবিক প্রযুক্তির বিকাশ ঘটানোর সুযোগ দিচ্ছে, যা কেবল ভণ্ডামি ও বেপরোয়া মনোভাবেরই পরিচায়ক।
এই চুক্তিতে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের অনুমতি দেওয়া হলে তা ২০০৯ সালে সংযুক্ত আরব আমিরাতের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের করা চুক্তির চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা হবে, কারণ আমিরাতকে নিজস্ব পারমাণবিক জ্বালানি তৈরির অনুমতি দেওয়া হয়নি।
এছাড়া ইসরায়েলের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার যে পূর্বশর্ত যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে দিয়ে আসছিল, ভূ-রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতায় সেটিও এবার প্রত্যাহার করা হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। চীন ও রাশিয়ার সাথে পারমাণবিক বিষয়ে সৌদি আরবের ক্রমবর্ধমান ঘনিষ্ঠতা ঠেকাতেই সম্ভবত ওয়াশিংটন তড়িঘড়ি করে এই ছাড় দিয়েছে। তবে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান মিত্র ইসরায়েল এই উদ্যোগ নিয়ে গভীর শঙ্কা প্রকাশ করেছে।
তাদের আশঙ্কা, এই পরিকল্পনা শেষ পর্যন্ত সৌদি আরবকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সক্ষমতার দিকেই নিয়ে যাবে। ২০১৮ সালে সৌদি আরবের কার্যত শাসক ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমানের করা একটি মন্তব্য এই শঙ্কাকে আরও জোরালো করে। সেসময় তিনি স্পষ্টভাবেই জানিয়েছিলেন, তার দেশ পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির পরিকল্পনা করছে না ঠিকই, তবে ইরান যদি পারমাণবিক বোমা তৈরি করে, তবে সৌদি আরবও যত দ্রুত সম্ভব একই পথে হাঁটবে। সূত্র: বিবিসি


আপনার মতামত লিখুন :