টানা ও রেকর্ডভাঙা ভারী বর্ষণে বন্দরনগরী চট্টগ্রামের বিস্তীর্ণ এলাকা আবারও পানির নিচে তলিয়ে গেছে। মৌসুমী বায়ুর তীব্র প্রভাবে আগ্রাবাদ, চকবাজার, বাকলিয়া, চান্দগাঁও, পতেঙ্গাসহ নগরীর প্রায় সব নিচু এলাকার প্রধান সড়ক ও অলিগলি এখন থৈ থৈ পানির নিচে। বহু মানুষের বাসাবাড়ির নিচতলা এবং ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে নোংরা পানি ঢুকে পড়ায় সীমাহীন দুর্ভোগে পড়েছেন নগরবাসী, বিশেষ করে অফিসগামী সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ীরা।
মঙ্গলবার (৭ জুলাই) সকাল থেকেই নগরীর নিচু এলাকাগুলোতে দ্রুত পানি জমতে শুরু করে। কোথাও হাঁটুপানি, আবার কোথাও কোমরপানি জমে যাওয়ায় যান চলাচল স্থবির হয়ে পড়ে, যার ফলে বিভিন্ন সড়কে সৃষ্টি হয় মাইলের পর মাইল দীর্ঘ যানজট।
সবচেয়ে বেশি বিপর্যয়ের মুখে পড়েছেন আগ্রাবাদ, চকবাজার, বাকলিয়া, কাজির হাট, হালিশহর, চান্দগাঁও, সুন্নিয়া মাদ্রাসা রোড, আকমল আলী রোড, পতেঙ্গা ও কুয়াইশ এলাকার বাসিন্দারা। এসব এলাকার শত শত বাসাবাড়ি ও দোকানে পানি ঢুকে গৃহস্থালির মূল্যবান আসবাবপত্র ও দোকানের ব্যবসায়িক মালামাল নষ্ট হয়েছে।
আগ্রাবাদের ভুক্তভোগী ব্যবসায়ী আবদুল কাদের ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “সকালে দোকানে পানি ঢুকে কিছু মালামাল একদম নষ্ট হয়ে গেছে। একটু ভারী বৃষ্টি হলেই আমাদের এভাবে লোকসান গুনতে হয়।” অন্যদিকে মুরাদপুর সুন্নিয়া মাদ্রাসা এলাকার বাসিন্দা আব্দুর রহিম বলেন, “সকালের বৃষ্টিতেই বাসার নিচতলায় পানি উঠে গেছে। আমরা এখন কার্যত ঘরবন্দি হয়ে পড়েছি।”
আজ সকালে অফিস ও কর্মস্থলের উদ্দেশ্যে বের হওয়া মানুষদের দুর্ভোগ ছিল সবচেয়ে চোখে পড়ার মতো। সড়কে গণপরিবহন ও সিএনজিচালিত অটোরিকশার তীব্র সংকট দেখা দেওয়ায় অনেককে প্যান্ট গুটিয়ে, জুতো হাতে নিয়ে ময়লা পানির মধ্য দিয়ে হেঁটে গন্তব্যে রওনা হতে দেখা গেছে।
জলাবদ্ধতা নিয়ে নগরবাসীর মনে এখন তীব্র ক্ষোভ। স্থানীয়দের স্পষ্ট অভিযোগ, চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা নিরসনে বিগত বছরগুলোতে হাজার হাজার কোটি টাকার মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন বা সিডিএ-সিটি করপোরেশনের নানা আশ্বাস দেওয়া হলেও, বাস্তবে সামান্য ভারী বৃষ্টিতেই পুরো শহর পানিতে তলিয়ে যায়।
বাকলিয়ার বাসিন্দা হাসান হতাশা ব্যক্ত করে বলেন, “সকালে বৃষ্টির পরই বাসার নিচতলায় পানি ঢুকে যায়। তড়িঘড়ি করে আসবাবপত্র নিরাপদ স্থানে সরাতে হয়েছে। এত হাজার কোটি টাকার প্রজেক্টের গল্প শুনি, কিন্তু জলাবদ্ধতার তো কোনো স্থায়ী সমাধান দেখছি না!”
আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে চট্টগ্রাম অঞ্চলে রেকর্ড পরিমাণ বৃষ্টিপাত হয়েছে, যা আরও কয়েক দিন স্থায়ী হতে পারে।
নগরীর পতেঙ্গা আবহাওয়া অফিসের কর্মকর্তা মাহমুদুল আলম জানান, সোমবার সকাল ৯টা থেকে আজ মঙ্গলবার সকাল ৯টা পর্যন্ত গত ২৪ ঘণ্টায় পতেঙ্গা এলাকায় রেকর্ড ৩৩০ দশমিক ৮ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত নথিভুক্ত করা হয়েছে।
অন্যদিকে আমবাগান আবহাওয়া অফিসের অফিসার ইনচার্জ বিজন রায় জানান, তাদের স্টেশনে গত ২৪ ঘণ্টায় ২৫৯ মিলিমিটার বৃষ্টি রেকর্ড করা হয়েছে। তিনি সতর্ক করে বলেন, মৌসুমি বায়ুর তীব্র প্রভাবের কারণে আগামী আরও দুই থেকে তিন দিন এই ভারী বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকতে পারে, যার ফলে চট্টগ্রামের নিচু এলাকাগুলোর বন্যা ও জলাবদ্ধতা পরিস্থিতি আরও অবনতি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।


আপনার মতামত লিখুন :