টানা কয়েক দিনের অবিরাম ও অতি ভারী বর্ষণে বন্দরনগরী চট্টগ্রাম এখন এক জলমগ্ন জনপদে পরিণত হয়েছে। মঙ্গলবার (৭ জুলাই) সকাল থেকে আজ বুধবার (৮ জুলাই) দুপুর পর্যন্ত হওয়া রেকর্ডভাঙা বৃষ্টিতে নগরের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ এলাকা পানির নিচে তলিয়ে গেছে। প্রধান সড়ক থেকে শুরু করে অলিগলি, এমনকি শত শত বাসাবাড়ি ও দোকানপাটে হাঁটু থেকে কোমর সমান পানি থৈ থৈ করছে। এই চরম দুর্যোগের কারণে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের অধীনে আজকের (৮ জুলাই) অনুষ্ঠিতব্য এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা স্থগিত করতে বাধ্য হয়েছে কর্তৃপক্ষ।

নগরের আগ্রাবাদ, চকবাজার, বাকলিয়া, চান্দগাঁও, হালিশহর, পাঁচলাইশ, কাতালগঞ্জ, মুরাদপুর, পতেঙ্গা, কুয়াইশ, আকমল আলী সড়ক, হাজি পাড়া, লালদিঘির পাড়, সিঅ্যান্ডবি মোড় এবং পলিটেকনিক মোড়সহ বেশিরভাগ এলাকার নিচতলার বাসিন্দারা চরম মানবেতর দিন কাটাচ্ছেন। বহু ঘরে পানি ঢুকে রান্নাবান্না সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেছে। অনেক এলাকায় টয়লেট ও ড্রেনের পানি একাকার হয়ে যাওয়ায় পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা অচল হয়ে পড়েছে, যা তীব্র স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করছে।
আগ্রাবাদের বাসিন্দা রেহানা বেগম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “রান্নাঘরে কোমর সমান পানি। সকাল থেকে ছোট বাচ্চাদের নিয়ে না খেয়ে শুকনো খাবার খেয়ে বেঁচে আছি। চুলা জ্বালানোর কোনো উপায় নেই।” চকবাজারের বাসিন্দা আবদুর রহিম বলেন, “ড্রেন আর টয়লেটের পানি এক হয়ে ঘরের ভেতর ঢুকেছে। দুর্গন্ধে ঘরে থাকা দায় হয়ে পড়েছে।”

টানা বৃষ্টিতে রেললাইন পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ায় ঢাকা থেকে কক্সবাজারগামী আন্তঃনগর ‘পর্যটক এক্সপ্রেস’ ট্রেনটি বড় ধরনের বিপাকে পড়ে। মঙ্গলবার দুপুরে চট্টগ্রামের ষোলোশহর এলাকায় লাইনে অতিরিক্ত পানি থাকায় ট্রেনটি আটকে যায়। প্রায় ১ হাজার যাত্রী নিয়ে দীর্ঘ ১১ ঘণ্টা স্টেশনে অপেক্ষা করার পর, যাত্রীদের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে রাত ১১টার দিকে ট্রেনটির যাত্রা সম্পূর্ণ বাতিল ঘোষণা করে রেল কর্তৃপক্ষ।
রেলওয়ের চট্টগ্রাম বিভাগীয় পরিবহন কর্মকর্তা ফারহান মাহমুদ বলেন, “রেললাইনের ওপর অতিরিক্ত স্রোত ও পানি থাকায় যাত্রীদের নিরাপত্তার স্বার্থে ট্রেনটির যাত্রা বাতিল করা ছাড়া বিকল্প কোনো পথ ছিল না।” রেল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ক্ষতিগ্রস্ত যাত্রীদের টিকিটের সম্পূর্ণ টাকা ফেরত দেওয়া হবে।

পতেঙ্গা ও আমবাগান আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, মৌসুমি বায়ু অত্যন্ত সক্রিয় থাকায় গত ২৪ ঘণ্টায় চট্টগ্রামে রেকর্ড ২৮৪ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত নথিভুক্ত করা হয়েছে।
আবহাওয়াবিদ আবদুল হামিদ জানান, বঙ্গোপসাগর থেকে আসা আর্দ্র বাতাসের কারণে ঘন ঘন মেঘ তৈরি হচ্ছে। এই সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে আগামী আরও অন্তত দুই দিন চট্টগ্রামে এমন ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকতে পারে, যার ফলে জলাবদ্ধতার পাশাপাশি পাহাড়ধসের ঝুঁকিও বহুগুণ বেড়ে গেছে। প্রয়োজন ছাড়া কাউকে ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ি এলাকায় না যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। ইতিমধ্যেই দেয়াল ও পাহাড়ধসে রাঙ্গুনিয়া, রাঙামাটির বাঘাইছড়ি এবং কক্সবাজারে ছয়জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে।

পাহাড়ি এলাকায় অতিবৃষ্টির কারণে আকস্মিক ঢল ও হড়পা বানের আশঙ্কায় পর্যটকদের সুরক্ষার্থে চট্টগ্রামের মিরসরাই উপজেলার বারৈয়াঢালা রেঞ্জের আওতাধীন সব পাহাড়ি ঝরনা আগামী ৩ দিনের জন্য সম্পূর্ণ বন্ধ ঘোষণা করেছে চট্টগ্রাম উত্তর বন বিভাগ।
বারৈয়াঢালা রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. আশরাফুল আলম স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, ৭ জুলাই থেকে ১০ জুলাই পর্যন্ত বারৈয়াঢালা ন্যাশনাল পার্কের আওতাধীন সব ঝরনায় পর্যটকদের প্রবেশ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ থাকবে এবং এই সময়ে কোনো টিকিট বিক্রি করা যাবে না।
মিরসরাই উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) সোমাইয়া আক্তার বলেন, “এই সময়ে ঝরনাগুলোতে পানির স্রোত অত্যন্ত বিপজ্জনক থাকে। যেকোনো ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনা এড়াতে এই সাময়িক নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে এবং ইজারাদারদের কড়া নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।”


আপনার মতামত লিখুন :