ঢাকা মঙ্গলবার, ০৩ মার্চ, ২০২৬, ১৯ ফাল্গুন ১৪৩২
Daily Global News

শীতে পেশি ও জয়েন্ট শক্ত হয়ে যায় কেন? জানুন কার্যকর সমাধান

প্রকাশিত: ফেব্রুয়ারি ৬, ২০২৬, ১০:১২ পিএম

শীতে পেশি ও জয়েন্ট শক্ত হয়ে যায় কেন? জানুন কার্যকর সমাধান

শীত এলেই অনেকের শরীরে একধরনের অস্বস্তি শুরু হয়—পেশি টানটান লাগে, জয়েন্টে ব্যথা বাড়ে, নড়াচড়া যেন আগের চেয়ে কঠিন হয়ে পড়ে। সাধারণভাবে ঠান্ডা আবহাওয়াকেই এর জন্য দায়ী করা হয়। তবে চিকিৎসকদের মতে, শীতকালীন এই শক্তভাবের পেছনে শুধু ঠান্ডা নয়, বরং দৈনন্দিন অভ্যাসের পরিবর্তনও বড় ভূমিকা রাখে।

শীতকালে মানুষ তুলনামূলকভাবে কম নড়াচড়া করে, বেশি সময় বসে থাকে এবং শরীরকে ঠিকভাবে প্রস্তুত না করেই ঠান্ডায় বের হয়। এসব কারণ মিলেই ধীরে ধীরে শরীর শক্ত হয়ে যেতে শুরু করে। শীতের প্রভাব কীভাবে শরীরের উপর পড়ে তা বুঝতে পারলে আগেভাগেই সতর্ক হওয়া সম্ভব এবং অস্বস্তি অনেকটাই কমানো যায়।

শীতে শরীর শক্ত হয়ে যাওয়ার কারণ

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, শীতকালীন পেশি ও জয়েন্টের শক্তভাব মূলত পরিবেশগত ও আচরণগত পরিবর্তনের সম্মিলিত ফল। শীতকালে মানুষ বেশি সময় সোফা, গাড়ি কিংবা ডেস্কে বসে কাটায়। এতে রক্ত সঞ্চালন কমে যায় এবং জয়েন্টে প্রয়োজনীয় লুব্রিকেশন ঠিকভাবে হয় না। ফলে পেশি ও জয়েন্ট ধীরে ধীরে শক্ত হয়ে ওঠে।

ঠান্ডা আবহাওয়ায় পেশি স্বাভাবিকভাবেই সংকুচিত হয়, যার ফলে শরীরের নমনীয়তা কমে যায় এবং আঘাত পাওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়। শুধু পেশিই নয়, ঠান্ডা একসঙ্গে প্রভাব ফেলে পেশি, জয়েন্ট এবং রক্ত সঞ্চালনের ওপর। তাপমাত্রা কমে গেলে শরীরের প্রান্তিক অংশে—বিশেষ করে হাত ও পায়ে—রক্ত প্রবাহ কমে যায়, ফলে জয়েন্ট ঠিকভাবে নড়াচড়া করতে চায় না।

চিকিৎসকদের অভিজ্ঞতায় দেখা যায়, আর্থ্রাইটিসে আক্রান্ত ব্যক্তি, আগের কোনো আঘাত রয়েছে এমন মানুষ বা জয়েন্টের দীর্ঘমেয়াদি সমস্যায় ভোগা রোগীদের ক্ষেত্রে শীতের প্রভাব বেশি দেখা যায়। তবে পুরোপুরি সুস্থ ও সক্রিয় মানুষও দীর্ঘ সময় ঠান্ডায় বসে থাকলে এই শক্তভাব অনুভব করেন।

বিশেষজ্ঞরা আরও বলছেন, আপনি কোথায় থাকেন সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। যেসব অঞ্চলে সারা বছর গরম থাকে, সেখানে এই সমস্যা তুলনামূলকভাবে কম। আবার মৃদু শীতপ্রধান এলাকায় এর প্রভাব সীমিত হলেও প্রচণ্ড ঠান্ডার অঞ্চলে সমস্যা অনেক বেশি প্রকট হয়।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে সামান্য শক্তভাবও খুব অল্প সময়ে দীর্ঘমেয়াদি অস্বস্তিতে রূপ নিতে পারে। কয়েক দিন নড়াচড়া কম হলেই শরীর শক্ত হয়ে যায়, আর ব্যথা বাড়লে মানুষ আরও কম নড়াচড়া করে। এভাবেই তৈরি হয় এক ধরনের দুষ্টচক্র।

শরীর শক্ত হয়ে থাকলে কী ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি হতে পারে

পেশি ও জয়েন্ট শক্ত হয়ে গেলে শরীর স্বাভাবিকভাবে নড়াচড়া করতে পারে না। এতে চলাফেরার ধরন বদলে যায় এবং শরীরের নির্দিষ্ট অংশে অতিরিক্ত চাপ পড়ে। দীর্ঘমেয়াদে এর ফলে পেশিতে টান, নড়াচড়ার পরিসর কমে যাওয়া এবং আঘাত পাওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়—বিশেষ করে শীতকালে পিচ্ছিল রাস্তা বা অসমতল জায়গায় হাঁটার সময়।

একটি জয়েন্টে ব্যথা থাকলে শরীর স্বাভাবিকভাবেই অন্য জয়েন্ট দিয়ে সেই চাপ সামলানোর চেষ্টা করে। যেমন, হাঁটুতে ব্যথা থাকলে মানুষ অজান্তেই অন্য পায়ে বেশি ভর দেয়। এতে উল্টো পাশের হাঁটু, কোমর বা হিপে অতিরিক্ত চাপ পড়ে এবং নতুন সমস্যা তৈরি হতে পারে।

শরীরের চলাচল ক্ষমতা সরাসরি মানুষের সামগ্রিক সুস্থতা ও দীর্ঘায়ুর সঙ্গে সম্পর্কিত। দীর্ঘদিন শরীর শক্ত ও নিষ্ক্রিয় থাকলে পেশির শক্তি ও আকার কমতে থাকে। এর ফলে পড়ে যাওয়া, হাড় ভাঙা, হৃদ্‌রোগজনিত জটিলতা এমনকি স্মৃতিভ্রংশের ঝুঁকিও বাড়তে পারে—এমন প্রমাণও কিছু গবেষণায় পাওয়া গেছে।

শীতে শরীর শক্ত হওয়া কীভাবে কমাবেন ও প্রতিরোধ করবেন

শীতকালে শরীর শক্ত হওয়া খুব সাধারণ সমস্যা হলেও এটি অনিবার্য নয়। কিছু অভ্যাস মেনে চললে পেশি ও জয়েন্ট অনেকটাই স্বাভাবিক রাখা সম্ভব।

ঘরের ভেতরেও সক্রিয় থাকুন
শীত এলেই শরীরচর্চা বন্ধ করে দেওয়া সবচেয়ে বড় ভুল। প্রতিদিন অল্প সময় হলেও হাঁটা, হালকা ব্যায়াম বা শরীরের ওজন দিয়ে ব্যায়াম করলে রক্ত সঞ্চালন ভালো থাকে। বড় কোনো কঠিন রুটিন বানানোর দরকার নেই—ছোট ছোট নড়াচড়াই অনেক উপকার করে।

নিয়মিত স্ট্রেচিং করুন
নড়াচড়ার পাশাপাশি স্ট্রেচিংও জরুরি। বিশেষ করে কোমর, পিঠ ও শরীরের উপরের অংশের স্ট্রেচিং শরীরকে নমনীয় রাখতে সাহায্য করে। ধীর ও দীর্ঘ সময় ধরে করা স্ট্রেচিং—যেমন যোগব্যায়ামের ভঙ্গি—স্বল্প সময়ের দ্রুত স্ট্রেচের চেয়ে বেশি উপকারী এবং আঘাতের ঝুঁকিও কম।

আবহাওয়া অনুযায়ী পোশাক পরুন
ঠান্ডায় বের হওয়ার আগে শরীর গরম রাখার ব্যবস্থা করুন। অতিরিক্ত একটি স্তরের কাপড়, গ্লাভস, স্কার্ফ ও উপযুক্ত জুতা পেশি ও জয়েন্টকে উষ্ণ রাখতে সাহায্য করে। ঠান্ডায় বের হওয়াকে যেন খেলাধুলার মতো ধরে নিয়ে শরীর প্রস্তুত করে নিন।

ওয়ার্ম-আপ ও কুল-ডাউন করুন
শীতে ভারী কাজের আগে ও পরে শরীর প্রস্তুত করা খুব জরুরি। বাইরে যাওয়ার আগে কয়েক মিনিট হালকা নড়াচড়া বা স্ট্রেচিং করলে পেশি প্রস্তুত হয়। কাজ শেষে আবার কিছু সময় শরীরকে ধীরে ধীরে স্বাভাবিক অবস্থায় ফেরান।

শরীরের সংকেত উপেক্ষা করবেন না
যদি শক্তভাব বা ব্যথা দীর্ঘদিন থাকে, বাড়তে থাকে বা দৈনন্দিন কাজকর্মে বাধা দেয়, তাহলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। সমস্যা শুরুতেই ধরতে পারলে চিকিৎসা অনেক সহজ হয়।

সব মিলিয়ে বলা যায়, শীতকালে শরীর শক্ত হওয়া একটি স্বাভাবিক অভিজ্ঞতা হলেও সচেতনতা ও নিয়মিত যত্নের মাধ্যমে এটিকে নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। সামান্য যত্নই আপনাকে পুরো শীতজুড়ে স্বস্তিতে চলাফেরা করার সুযোগ করে দিতে পারে।

ডেইলি গ্লোবাল নিউজ

banner
Link copied!