ঢাকা সোমবার, ২৫ মে, ২০২৬, ১০ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
Daily Global News

ধীরে ধীরে স্বপ্নের পথে এগিয়ে চলেছেন রাতুল

প্রকাশিত: মে ১৯, ২০২৬, ০১:৪৩ পিএম

ধীরে ধীরে স্বপ্নের পথে এগিয়ে চলেছেন রাতুল

ঢাকার সাভারের আমিনবাজারের বড়দেশি এলাকার এক সাধারণ তরুণ। চারপাশে আর দশটা ছেলের মতোই বেড়ে ওঠা। কিন্তু ছোটবেলা থেকেই তার ভেতরে ছিল অন্যরকম এক টান ক্যামেরার প্রতি, ছবির প্রতি, নিজেকে নতুনভাবে উপস্থাপনের প্রতি। সেই ভালোলাগা ধীরে ধীরে পরিণত হয় স্বপ্নে। আর সেই স্বপ্নই আজ তাকে নিয়ে এসেছে পেশাদার মডেলিং জগতে। বলছিলাম তরুণ মডেল মিজানুর রহমান রাতুলের কথা, যিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বেশি পরিচিত “মিজানুর রাতুল” নামে।

২০০৩ সালের ১০ মে জন্ম নেওয়া রাতুল সম্প্রতি ২৩ বছরে পা রেখেছেন। পড়াশোনা শুরু করেছিলেন ইংরেজি বিভাগে অনার্সে। তবে নানা বাস্তবতায় সেই পড়াশোনা শেষ করা হয়নি। কিন্তু থেমে থাকেননি তিনি। নিজের ভেতরের স্বপ্নটাকেই বেছে নিয়েছেন জীবনের পথ হিসেবে।


ছবি তোলার নেশা থেকেই স্বপ্নের শুরু

ছোটবেলায় নিজের কোনো স্মার্টফোন ছিল না। মামাতো ভাইয়ের ফোন দিয়েই ছবি তুলতেন। সেই ছবিগুলো ফেসবুকে আপলোড করতেন নিয়মিত। তখন হয়তো বুঝতে পারেননি এই ছোট ছোট মুহূর্তই একদিন তার জীবনের বড় পরিচয় হয়ে দাঁড়াবে।

রাতুল বলেন, “ছোটবেলা থেকেই ফটোশুট আর ক্যামেরার সামনে দাঁড়ানো খুব ভালো লাগতো। নিজের ছবি দেখতে ভালো লাগতো। ধীরে ধীরে বুঝলাম, এটা শুধু শখ না এটা আমার প্যাশন।”

নিজের ফোন হাতে পাওয়ার পর সেই আগ্রহ আরও বাড়ে। বিভিন্ন স্টাইলে ছবি তোলা, নতুন নতুন পোজ দেওয়া, নিজেই ছবি এডিট করা সবকিছুই করতে শুরু করেন নিজের মতো করে। কলেজ জীবনে এক ঘনিষ্ঠ বন্ধুর ডিএসএলআর ক্যামেরা যেন তার স্বপ্নে নতুন মাত্রা যোগ করে।

বন্ধুর ক্যামেরায় ছবি তুলে তিনি নিজেই পেশাদারদের মতো এডিট করতেন এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উপস্থাপন করতেন। সেখান থেকেই ধীরে ধীরে ছোটখাটো প্রমোশনাল কাজের সুযোগ আসতে থাকে।

একটি মেসেজ বদলে দিল জীবন

জীবনের মোড় ঘুরে যায় হঠাৎ করেই। একদিন ফেসবুকে একটি মেসেজ রিকোয়েস্ট আসে। প্রেরক ছিলেন দেশের জনপ্রিয় ফ্যাশন ব্র্যান্ড বিশ্বরঙ-এর কর্ণধার বিপ্লব সাহা।

রাতুল বলেন, “দাদা আমার ছবি দেখে জানতে চাইলেন, আমি প্রফেশনালি কাজ করতে আগ্রহী কিনা। আমি বললাম, সুযোগ পেলে অবশ্যই ভালো কিছু করতে চাই।”

পরবর্তীতে তাকে মিরপুরে বিশ্বরঙের শোরুমে ডাকা হয়। সেখানে গিয়ে তিনি দেখেন টাঙ্গাইল শাড়ির একটি বড় প্রফেশনাল শুট চলছে। চারদিকে আলো, ক্যামেরা, মেকআপ আর অভিজ্ঞ মডেলদের উপস্থিতি সব মিলিয়ে যেন অন্য এক জগৎ।

কিন্তু কিছুক্ষণ পর হঠাৎই তাকে বলা হয়, “রেডি হও, তোমার শুট হবে।” এই মুহূর্তটার কথা বলতে গিয়ে এখনও আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন রাতুল।

“আমি একদম নার্ভাস হয়ে গিয়েছিলাম। আগে কখনো এত বড় সেটআপে কাজ করিনি। মনে হচ্ছিল পারবো তো? পরে নিজেকে বললাম ভয় পাস না, নিজের মতো করেই দাঁড়া।”

সেই ভয়, উত্তেজনা আর স্বপ্নের মিশ্র অনুভূতি নিয়েই প্রথমবার ক্যামেরার সামনে দাঁড়ান তিনি।

অপেক্ষার দীর্ঘ সময়, তারপর জীবনের সবচেয়ে বড় চমক

অক্টোবরে শুটিং শেষ হলেও নভেম্বর পেরিয়ে যায়, কিন্তু কাজ প্রকাশিত হয় না। ধীরে ধীরে হতাশ হয়ে পড়েন রাতুল। মনে হচ্ছিল হয়তো তিনি ভালো করতে পারেননি।

“আমি খুব আপসেট হয়ে গিয়েছিলাম। মনে হচ্ছিল, হয়তো আমি ঠিকভাবে কাজটা করতে পারিনি,” বলছিলেন তিনি।

কিন্তু ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারি সকালটি বদলে দেয় সবকিছু। ঘুম থেকে উঠে ফোন হাতে নিয়েই দেখেন তার কাজ প্রকাশিত হয়েছে।

“আমি বিশ্বাসই করতে পারছিলাম না। অনেক আনন্দ লাগছিল। মনে হচ্ছিল, এতদিনের অপেক্ষা সার্থক হয়েছে।”

কিছুক্ষণ পর ফোন আসে বিপ্লব সাহার। 
“কেমন লাগলো সারপ্রাইজ?” জানতে চান তিনি। সেদিনই রাতুল বুঝেছিলেন, স্বপ্ন পূরণে ধৈর্যেরও আলাদা মূল্য আছে।

প্রফেশনাল ক্যারিয়ারের নতুন অধ্যায়

বিশ্বরঙ দিয়েই মূলত শুরু হয় তার পেশাদার মডেলিং যাত্রা। এরপর তিনি কাজ করেছেন একটি মিউজিক ভিডিওতে, জনপ্রিয় রেস্টুরেন্ট প্রজেক্টে এবং সম্প্রতি প্রথমবারের মতো অংশ নিয়েছেন র‍্যাম্প শোতেও।

র‍্যাম্পে হাঁটার অভিজ্ঞতা নিয়ে রাতুল বলেন, “এটা একদম ভিন্ন অনুভূতি। ক্যামেরার সামনে দাঁড়ানো আর লাইভ অডিয়েন্সের সামনে হাঁটা-দুটো সম্পূর্ণ আলাদা অনুভব। কিন্তু দুটোই আমার খুব প্রিয়।”


পরিবারের সমর্থন ছিল না, কিন্তু থামেনি স্বপ্ন

মডেলিংয়ে আসার পথে সবচেয়ে বড় বাধাগুলোর একটি ছিল পারিবারিক অনাগ্রহ। অনেকেই তাকে অন্য পেশায় মনোযোগ দিতে বলেছেন। কিন্তু তিনি নিজের স্বপ্ন ছাড়েননি।

বাংলাদেশের জনপ্রিয় মডেল নোবেলকে নিজের অনুপ্রেরণা হিসেবে দেখেন রাতুল।

“ছোটবেলা থেকে উনার বিজ্ঞাপন দেখে বড় হয়েছি। এখনও উনার কাজ দেখি। শেখার চেষ্টা করি। আমার ইচ্ছা, একদিন উনার সঙ্গে একই ফ্রেমে কাজ করার।”

ক্যামেরার বাইরের মানুষটি

ক্যামেরার ঝলমলে দুনিয়ার বাইরে রাতুল খুব সাধারণ জীবনযাপন পছন্দ করেন। খেতে ভীষণ ভালোবাসেন। বিশেষ করে চিকেনের প্রায় সব খাবারই তার পছন্দের। প্রিয় রং সাদা হলেও পোশাকে ডার্ক কালারের প্রতি আলাদা আকর্ষণ রয়েছে। অবসর সময় কাটে উপন্যাস পড়ে কিংবা অডিও বুক শুনে।

নিউকামারদের জন্য সুযোগ চান

বর্তমান মডেলিং ইন্ডাস্ট্রিতে নতুনদের সংগ্রাম নিয়ে খোলামেলা কথা বলেন রাতুল। তার ভাষায়, “অনেক প্রতিভাবান নতুন মুখ আছে, কিন্তু সুযোগের অভাবে তারা সামনে আসতে পারে না। সিনিয়ররা যদি নতুনদের জন্য আরও সুযোগ তৈরি করতেন, তাহলে অনেক ভালো প্রতিভা উঠে আসতো।”

স্বপ্ন, সংগ্রাম, ধৈর্য আর আত্মবিশ্বাস-এই চারটিকেই নিজের পথচলার মূল শক্তি মনে করেন মিজানুর রাতুল। আমিনবাজারের ছোট্ট এক তরুণের চোখে এখন বড় স্বপ্ন একদিন দেশের প্রথম সারির মডেলদের কাতারে নিজের নাম দেখতে চান তিনি।

আর সেই স্বপ্নের পথে, ধীরে ধীরে হলেও, এগিয়ে চলেছেন দৃঢ় আত্মবিশ্বাস নিয়েই।

ডিজিএন/এনএস

banner
Link copied!