ঢাকা শনিবার, ০৬ জুন, ২০২৬, ২৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
Daily Global News
ট্রাম্পের যুদ্ধনীতিতে নিজ দলেই বিদ্রোহ

ইরান যুদ্ধ বন্ধের পক্ষে মার্কিন কংগ্রেসের নিম্নকক্ষে প্রস্তাব পাস

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: জুন ৪, ২০২৬, ১১:২৯ এএম

ইরান যুদ্ধ বন্ধের পক্ষে মার্কিন কংগ্রেসের নিম্নকক্ষে প্রস্তাব পাস

ইরানের বিরুদ্ধে নতুন করে যেকোনো ধরনের একক সামরিক পদক্ষেপ গ্রহণ করা থেকে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে বিরত রাখতে মার্কিন কংগ্রেসের নিম্নকক্ষ ‘হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভস’ বা প্রতিনিধি পরিষদে একটি ঐতিহাসিক প্রস্তাব পাস হয়েছে। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে শুরু হওয়া ইরান যুদ্ধের বিষয়ে মার্কিন আইনপ্রণেতাদের তীব্র অসন্তোষের জেরে বুধবার (৩ জুন) এই বিলটি পাস হয়।

সবচেয়ে চমকপ্রদ বিষয় হলো, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের যুদ্ধংদেহী নীতির বিরুদ্ধে ডেমোক্র্যাটদের আনা এই প্রস্তাবে খোদ ট্রাম্পের নিজের দল রিপাবলিকান পার্টির শীর্ষ কজন জনপ্রতিনিধিও সমর্থন দিয়েছেন।

মার্কিন নিম্নকক্ষে অত্যন্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ এই ভোটাভুটিতে বিলটির পক্ষে ২১৫টি ভোট পড়ে। অন্যদিকে, ট্রাম্পের যুদ্ধনীতি বজায় রাখার পক্ষে ভোট পড়ে ২০৮টি। ডেমোক্র্যাটদের আনা এই বিলে রিপাবলিকান পার্টির অন্তত চারজন সদস্য সরাসরি ট্রাম্পের বিপক্ষে গিয়ে ভোট দেওয়ায় মাত্র ৭ ভোটের ব্যবধানে বিলটি পাস করা সম্ভব হয়। মার্কিন প্রেসিডেন্টের এককভাবে যুদ্ধে জড়ানোর ক্ষমতা কমানোর জন্য প্রতিনিধি পরিষদে এটি চলতি মেয়াদে চতুর্থ প্রচেষ্টা।

যে চারজন রিপাবলিকান সদস্য বুধবার ট্রাম্পের অবাধ্য হয়ে ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে একজোট হয়েছেন, তারা হলেন- টমাস ম্যাসি, ব্রায়ান ফিটজপ্যাট্রিক, টম ব্যারেট এবং ওয়ারেন ডেভিডসন। এছাড়া মেইনের ডেমোক্র্যাট সদস্য জ্যারেড গোল্ডেন, যিনি অতীতে এই ধরনের যুদ্ধবিরোধী প্রস্তাবের বিপক্ষে ছিলেন, তিনিও এবার মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ বন্ধের পক্ষে ভোট দিয়েছেন। এই ভোটাভুটি রিপাবলিকান পার্টির ভেতরের গভীর মতবিরোধ ও ট্রাম্পের নেতৃত্বের সংকটকে আবারও প্রকাশ্য এনেছে।

মার্কিন সংবিধান অনুযায়ী যুদ্ধ ঘোষণার একক ক্ষমতা কেবল কংগ্রেসেরই-এ বিষয়ে নিম্নকক্ষের অনেক সদস্যই নিজেদের অবস্থান পরিষ্কার করেছেন। মিশিগানের বিদায়ী রিপাবলিকান সদস্য টম ব্যারেট বলেন, “কংগ্রেস একাই যুদ্ধ ঘোষণা করতে পারে, এটা এমন একটা বিষয় যা নিয়ে আমাদের অবশ্যই সতর্ক থাকতে হবে।”

ক্ষমতাসীন দলের নেতা হয়েও মার্কিন প্রেসিডেন্টের সিদ্ধান্তের বিপক্ষে ভোট দিয়ে তিনি ট্রাম্পের শত্রু বা চক্ষুশূল হলেন কি-না, সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে ব্যারেট দৃঢ় কণ্ঠে বলেন, “আমার বিবেক যা বলেছে, আমি সেটি অনুযায়ী ভোট দিয়েছি। আমি এটাকেই সঠিক বলে মনে করি এবং সেজন্য এর যেকোনো রাজনৈতিক দায়ভার নিতে আমি প্রস্তুত আছি।”

নিজ দলের সদস্যদের এমন অনমনীয় অবস্থানের কারণে মাত্র কয়েকদিন আগেই ট্রাম্প প্রশাসন তাদের রাজনৈতিক মিত্রদের জন্য ১ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলারের একটি বিতর্কিত ‍‍`অস্ত্রবিরোধী‍‍` তহবিল গঠনের পরিকল্পনা থেকে পিছু হটতে বাধ্য হয়।

মার্কিন হাউস ফরেন অ্যাফেয়ার্স কমিটির প্রধান ও শীর্ষ ডেমোক্র্যাট প্রতিনিধি গ্রেগরি মিকস এই ভোটাভুটিকে স্বাগত জানিয়ে একে “প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ইরানে চালানো অবৈধ ও ব্যয়বহুল যুদ্ধের বিরুদ্ধে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ” হিসেবে বর্ণনা করেছেন। স্থায়ীভাবে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ শেষ করার লক্ষ্যে এটিকে তিনি "প্রথম পদক্ষেপ" বলেও অভিহিত করেন।

গ্রেগরি মিকস কড়া সমালোচনা করে বলেন, “ট্রাম্প যুদ্ধের ঘোষিত লক্ষ্য অর্জনে তো ব্যর্থ হয়েছেনই, উপরন্তু বৈশ্বিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়ে বিশ্ব অর্থনীতিকে সংকটে ফেলেছেন। যুদ্ধের কারণে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির বিষয়ে যে কূটনৈতিক সমাধানের চেষ্টা আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতাকারীরা (পাকিস্তান ও ওমান) চালাচ্ছিল, তা অর্জন করা আরও কঠিন হয়ে পড়েছে।”

তিনি আরও যোগ করেন, “আজ এই প্রস্তাব পাস হওয়ার বিষয়টি একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণের ইঙ্গিত দেয়। এর অর্থ হলো, এখন আরও অধিক সংখ্যক রিপাবলিকান নেতা তাদের ভোটারদের মনের কথা শুনছেন, যারা মধ্যপ্রাচ্যে আরেকটি অনির্দিষ্টকালের যুদ্ধ চান না।”

হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভসে এই ঐতিহাসিক বিল পাস হলেও এটি এখনই পূর্ণাঙ্গ আইনে পরিণত হচ্ছে না। এটি বাস্তবায়ন করতে হলে এখনও মার্কিন কংগ্রেসের উচ্চকক্ষ ‘সিনেট’-এর অনুমোদন প্রয়োজন হবে। তবে মার্কিন সিনেট বর্তমানে রিপাবলিকানদের সংখ্যাগরিষ্ঠ নিয়ন্ত্রণে রয়েছে, ফলে সেখানে বিলটি আটকে যাওয়ার জোর শঙ্কা রয়েছে। এর আগে সাতবার ব্যর্থ চেষ্টার পর গত মে মাসে সিনেটে একই ধরনের আরেকটি বিল উঠলেও তা নিয়ে এখনও পূর্ণাঙ্গ ভোটাভুটি হয়নি।

কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, সিনেটে পাস হলেও প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এই বিলে সরাসরি ‘ভেটো’ (নাকচ করার ক্ষমতা) দিতে পারেন। আর প্রেসিডেন্টের সেই ভেটো বাতিল করতে হলে মার্কিন কংগ্রেসের উভয় কক্ষে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে হবে, যা বর্তমান রাজনৈতিক মেরুকরণে ডেমোক্র্যাটদের জন্য প্রায় অসম্ভব। ফলে এই নতুন প্রচেষ্টাটি ইরানের বিরুদ্ধে ট্রাম্পের সামরিক পদক্ষেপকে শেষ পর্যন্ত কতটা নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে, তা নিয়ে এখনও গভীর সংশয় রয়ে গেছে।

ডিজিএন/এনএস

banner
Link copied!