ঢাকা আজ আর কেবল একটি শহর নয়; এটি এক ক্রমাগত ভেঙে পড়া ব্যবস্থার নাম। কয়েকশ বছরের পুরোনো এই রাজধানী এখন জনসংখ্যার চাপে এমন এক দমবন্ধ অবস্থায় পৌঁছেছে, যেখানে শহর আছে, কিন্তু নগরজীবন নেই; ভবন আছে, কিন্তু বাসযোগ্যতা নেই; রাস্তা আছে, কিন্তু চলাচল নেই। বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম নগরী হিসেবে ঢাকার নাম উচ্চারিত হলেও সেই গৌরবের আড়ালে লুকিয়ে আছে এক নির্মম সত্য ঢাকা এখন বসবাসের জন্য নয়, সহ্য করার জন্য শহর।
বিশ্লেষকেরা বহুদিন ধরে বলে আসছেন, একটি আদর্শ নগরে জনঘনত্ব, রাস্তা, সবুজ, জলাশয় সব কিছুরই একটি গ্রহণযোগ্য অনুপাত থাকতে হয়। কিন্তু ঢাকার বাস্তবতা তার সম্পূর্ণ বিপরীত। এখানে মানুষ বাড়ছে, ভবন বাড়ছে, গাড়ি বাড়ছে; কিন্তু রাস্তা বাড়ছে না, খাল বাঁচছে না, ফুটপাত নেই, শ্বাস নেওয়ার মতো খোলা জায়গাও নেই। শহরটিকে পরিকল্পিতভাবে গড়ে তোলার বদলে অপরিকল্পিত বিস্তারের পরীক্ষাগারে পরিণত করা হয়েছে।
সবচেয়ে ভয়াবহ হলো- ঢাকায় জনসংখ্যার চাপ এখন আর স্বাভাবিক নগরচাপ নয়, এটি এক ধরনের প্রশাসনিক ব্যর্থতা। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কাজের খোঁজে, উন্নত জীবনের আশায়, এমনকি জলবায়ুজনিত সংকট এড়াতেও প্রতিদিন হাজারো মানুষ ঢাকায় আসছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই মানুষদের জন্য কি উপযুক্ত অবকাঠামো তৈরি করা হয়েছে? উত্তর হলো না। বরং তাদের জন্য তৈরি হয়েছে আরও জ্যাম, আরও ভিড়, আরও বিশৃঙ্খলা।
ঢাকার সড়ক পরিস্থিতি এই ব্যর্থতার সবচেয়ে নগ্ন উদাহরণ। এক দশক আগে যেখানে গাড়ির গড় গতি ছিল ঘণ্টায় প্রায় ২১ কিলোমিটার, এখন তা নেমে এসেছে ৫ কিলোমিটারের আশপাশে। অর্থাৎ, গাড়ি এখন প্রায় মানুষের হাঁটার গতির কাছাকাছি চলে এসেছে। এ শহরে ৫ মিনিটের পথ পাড়ি দিতে ১ ঘণ্টা লাগে, ১ কিলোমিটার যেতে লাগে ধৈর্য, আর প্রতিদিন অফিসে যাওয়া মানে মানসিক যুদ্ধে নামা।
যানজট এখন শুধু সময়ের অপচয় নয়, এটি একটি অর্থনৈতিক খুন। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, ঢাকার যানজটে বছরে কয়েক হাজার কোটি টাকার ক্ষতি হচ্ছে। কর্মঘণ্টা নষ্ট, জ্বালানি অপচয়, দুর্ঘটনা, পরিবেশদূষণ সব মিলিয়ে ঢাকা এমন এক দুর্ভোগের নগরী, যেখানে উৎপাদনশীলতার চেয়ে ক্ষতির পরিমাণই বেশি। এই শহর দেশের অর্থনীতির ইঞ্জিন হওয়ার বদলে ক্রমে অর্থনীতির বোঝা হয়ে উঠছে।
কিন্তু শুধু যানজট নয়, সমস্যা আরও গভীরে। ঢাকার গণপরিবহনব্যবস্থা বিশৃঙ্খলার প্রতীক। বাস যেখানে সেখানে থামে, যাত্রী ওঠায়, ফুটপাত দখল হয়ে যায়, ব্যাটারিচালিত রিকশা আর অবৈধ যানবাহন সড়কে দাপট দেখায়, আর ট্রাফিক ব্যবস্থা দাঁড়িয়ে থাকে নীরব দর্শকের ভূমিকায়। শহরের মানুষ এখন আর নিয়মের ওপর ভরসা রাখে না; তারা অনুমান করে কখন বাস আসবে, কখন জ্যাম খুলবে, কখন গন্তব্যে পৌঁছাবে। এটি নগরব্যবস্থা নয়, এটি দৈনন্দিন অস্থিরতার জীবনচিত্র।
ঢাকার সংকটের আরেকটি নাম হলো কেন্দ্রীকরণ। কাজ, শিক্ষা, চিকিৎসা, আদালত, অফিস, শিল্প সবকিছু ঢাকায় জমা করে রেখে আমরা শহরটিকে এমনভাবে ঠেসে ধরেছি যে, সেটি এখন নিজের ভারেই নুয়ে পড়ছে। নগর পরিকল্পনাবিদেরা বহু বছর ধরে বলে আসছেন, দেশকে যদি বাঁচাতে হয়, তাহলে রাজধানীর বাইরেও কর্মসংস্থান, প্রশাসনিক সুযোগ, শিক্ষাব্যবস্থা, স্বাস্থ্যসেবা, এবং শিল্পকারখানা ছড়িয়ে দিতে হবে। কিন্তু নীতি যতটা বলিষ্ঠ, বাস্তবায়ন ততটাই দুর্বল।
মেট্রোরেল, ফ্লাইওভার, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে এসব প্রকল্প ঢাকায় হয়েছে, হচ্ছে, আরও হবে। কিন্তু এ শহরের সমস্যা কেবল অবকাঠামোর নয়; সমস্যা শাসনের, পরিকল্পনার, এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছার। প্রকল্প যতই হোক, যদি গণপরিবহন শৃঙ্খলাবদ্ধ না হয়, ফুটপাত দখলমুক্ত না হয়, বাস টার্মিনাল শহরের বাইরে না যায়, আর বিকেন্দ্রীকরণ শুরু না হয়, তাহলে ঢাকা কেবল কংক্রিটের ওপর কংক্রিট জুড়ে একটি বড় জটই হয়ে থাকবে।
নগরবাসীর জন্য সবচেয়ে বেদনাদায়ক সত্য হলো- ঢাকা তাদের জীবন সহজ করেনি, বরং কঠিন করেছে। মানুষ এখানে এসেছে বেঁচে থাকার জন্য, কিন্তু শহরটি তাদের সময় কেড়ে নিয়েছে, স্বাস্থ্য কেড়ে নিয়েছে, মানসিক শান্তি কেড়ে নিয়েছে। বাতাসে ধুলো, রাস্তায় শব্দ, দেয়ালে চাপ, মনে ক্লান্তি সব মিলিয়ে ঢাকা এখন এক মানসিক চাপের কারখানা।
এখন সময় আর কথার নয়। এখন দরকার সিদ্ধান্তের। ঢাকাকে বাঁচাতে হলে ঢাকার ক্ষমতা কমাতে হবে। শহরকে মানুষে গাদাগাদি না করে, সুযোগকে দেশজুড়ে ছড়িয়ে দিতে হবে। ঢাকার ওপর চাপ কমানো ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই। এই নগরীকে যদি সত্যিই বাসযোগ্য করতে হয়, তাহলে প্রথম কাজ হবে একে সবকিছুর কেন্দ্রবিন্দু বানানো বন্ধ করা।
ঢাকা আজ লাইফ সাপোর্টে আছে এ কথা অতিরঞ্জন নয়, বাস্তবতা। আর বাস্তবতা যত কঠিনই হোক, তা স্বীকার না করলে মুক্তি নেই। শহরকে শহর হতে দিতে হবে; নইলে এটি শুধু মানুষের ভিড়ের এক অচল স্মৃতিস্তম্ভ হয়ে থাকবে।


আপনার মতামত লিখুন :