ঢাকা সোমবার, ২৫ মে, ২০২৬, ১০ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
Daily Global News

হামে ৫০০ শিশুর মৃত্যু: ‘স্বাধীন তদন্ত’ করতে ডব্লিউএইচও-কে সরকারের অনুরোধ

ডিজিএন ডেস্ক

প্রকাশিত: মে ২৩, ২০২৬, ০৯:১২ পিএম

হামে ৫০০ শিশুর মৃত্যু: ‘স্বাধীন তদন্ত’ করতে ডব্লিউএইচও-কে সরকারের অনুরোধ

দেশে হাম ও এই রোগের উপসর্গে শিশুমৃত্যুর সংখ্যা ৫০০ ছাড়িয়ে যাওয়ার পর পরিস্থিতি খতিয়ে দেখতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও)-কে একটি ‘স্বাধীন তদন্ত’ (ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইনকোয়ারি) করার জন্য অনানুষ্ঠানিক অনুরোধ জানিয়েছে সরকার। বৈশ্বিক এই সংস্থাটির কাছ থেকেও এ বিষয়ে ইতিবাচক সাড়াও মিলেছে।

আজ শনিবার (২৩ মে) স্বাস্থ্য বিভাগ জানিয়েছে, গত ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত নিশ্চিত হামে ৮৬ জন এবং হামের উপসর্গ নিয়ে ৪২৬টি শিশু মারা গেছে। একই সময়ে সারাদেশে হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ৬২ হাজারের বেশি শিশু। এই অকল্পনীয় শিশুমৃত্যুর ঘটনায় টিকার সংকট, পূর্ববর্তী অন্তর্বর্তী সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্ত এবং বর্তমান প্রশাসনের মহামারি ব্যবস্থাপনার ঘাটতি নিয়ে তৈরি হয়েছে তীব্র রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক বিতর্ক।

প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্য বিষয়ক বিশেষ সহকারী এস এম জিয়াউদ্দিন হায়দার বিবিসি বাংলাকে বলেন, “আমরা কাউকে ঢালাও দোষারোপ করতে চাই না বা কাউকে এককভাবে দায়ও নিতে চাই না। তবে ভুলের যেন পুনরাবৃত্তি না হয়, সেজন্য হাম পরিস্থিতি কেন এই ভয়াবহ পর্যায়ে এলো তা জানা দরকার। এজন্যই একটি স্বাধীন তদন্তের জন্য ডব্লিউএইচও-কে আমরা অনানুষ্ঠানিকভাবে বলেছি। তারাও আগ্রহ দেখিয়েছে।”

তবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ইতিমধ্যেই বাংলাদেশের হাম পরিস্থিতি নিয়ে তীব্র উদ্বেগ প্রকাশ করে একে জাতীয়ভাবে ‘উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ’ বলে মূল্যায়ন করেছে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের এই যুগে বাংলাদেশে পাঁচ শতাধিক শিশুর এভাবে হামে মারা যাওয়া এক অকল্পনীয় ও লজ্জাজনক বিপর্যয়।

এই সংকটের সূত্রপাত নিয়ে আন্তর্জাতিক সংস্থা ইউনিসেফ (UNICEF) সম্প্রতি ঢাকায় এক সংবাদ সম্মেলন করে বিস্ফোরক অভিযোগ এনেছে। ইউনিসেফের বাংলাদেশ প্রতিনিধি রানা ফ্লাওয়ার্স জানান, হাম পরিস্থিতি নিয়ে বিগত অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারকে তারা অন্তত পাঁচটি চিঠি দিয়েছিলেন এবং বিভিন্ন বৈঠকে অন্তত ১০ বার সতর্ক করেছিলেন। কিন্তু তৎকালীন সরকার ইউনিসেফের মাধ্যমে প্রথাগত টিকা সংগ্রহ ব্যবস্থা বাদ দিয়ে উন্মুক্ত দরপত্র (ওপেন টেন্ডার) পদ্ধতি চালু করায় দেশে টিকার তীব্র ঘাটতি তৈরি হয়।

তবে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার সাবেক বিশেষ সহকারী (স্বাস্থ্য) অধ্যাপক ডা. সায়েদুর রহমান এই অভিযোগ সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যান করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, সব টিকা ইউনিসেফের মাধ্যমেই কেনা হয়েছিল এবং ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসেই তা সংগ্রহ করা হয়।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তৎকালীন এক কর্মকর্তা অবশ্য ভিন্ন তথ্য দিয়েছেন। তিনি জানান, প্রথমে ইউনিসেফের সাথে যোগাযোগ করা হলেও পরবর্তীতে পরিকল্পনা কমিশনের পরামর্শে উপদেষ্টা পরিষদ উন্মুক্ত দরপত্রের অনুমোদন দেয়। এরপর অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হলেও সরকারের ক্রয় সংক্রান্ত কমিটিতে সিদ্ধান্ত নিতে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও দেরি হওয়ার কারণেই মূলত পর্যাপ্ত টিকা সময়মতো দেশে আসেনি।

বর্তমান স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন বকুল হাম পরিস্থিতির জন্য বরাবরই বিগত সরকারের ব্যর্থতাকে দায়ী করছেন। আজ শনিবার সচিবালয়ে এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, “আগের সরকারের গাফিলতির কারণেই দেশে হামের প্রাদুর্ভাব ঘটেছে। তবে এই মুহূর্তে দোষীদের বিচারের চেয়ে আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসা দেওয়াই আমাদের অগ্রাধিকার।” তিনি জানান, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে প্রতি চার বছর পর পর হওয়ার কথা থাকা দেশব্যাপী বিশেষ টিকাদান ক্যাম্পেইনটি করা হয়নি।

তবে বর্তমান সরকারের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন দেশের অন্যতম শীর্ষ জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও স্বাস্থ্য বিভাগের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক বেনজির আহমদ। তিনি বলেন, “অন্তর্বর্তী সরকারের সিদ্ধান্ত গ্রহণে বিলম্বই টিকার সংকটের জন্য প্রাথমিকভাবে দায়ী; কিন্তু বর্তমান সরকারের সময়ে মহামারি শুরু হওয়ার পর এটাকে হালকাভাবে নেওয়ার কারণেই অনেক মৃত্যু প্রতিরোধ করা যায়নি। শুরুতেই একে ‘মহামারি’ ঘোষণা করে সর্বাত্মক ব্যবস্থা এবং জাতীয় নির্দেশিকা তৈরি করলে এত শিশুর প্রাণ যেত না।”

হামের উপসর্গে শত শত শিশুর মৃত্যুর জন্য দায়ীদের শাস্তি দাবি করে ঢাকায় নানা রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠন কর্মসূচি পালন করছে। বিষয়টি এখন গড়িয়েছে উচ্চ আদালত পর্যন্ত। সুপ্রিম কোর্টের একজন আইনজীবীর রিট আবেদনের প্রেক্ষিতে দেশে হামের প্রাদুর্ভাবে শিশুমৃত্যুর ঘটনা তদন্তে কেন একটি উচ্চপর্যায়ের ‘তদন্ত কমিশন’ গঠনের নির্দেশ দেওয়া হবে না, তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেছেন হাইকোর্ট। এই রিটে উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে টিকার সংকট তৈরির অভিযোগও আনা হয়েছে।

উদ্ভূত পরিস্থিতিতে স্বাস্থ্য সচিব ঢাকা এক অনুষ্ঠানে জানিয়েছেন, টিকার সংকট এবং হামে শিশুমৃত্যুর ঘটনা নিয়ে সরকারের পক্ষ থেকেও একটি অভ্যন্তরীণ তদন্ত শুরু হয়েছে। এতে কারও কোনো গাফিলতি ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা হবে।

মেডিকেল জার্নাল ‘দ্য ল্যানসেট’-এর তথ্য অনুযায়ী, কোভিড মহামারির সময় স্বাস্থ্যসেবা ভেঙে পড়া এবং বিশ্বজুড়ে টিকাবিরোধী প্রচারণার কারণে ২০২৪ ও ২০২৫ সালে গত ২০ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ হামের প্রাদুর্ভাব দেখা গেছে। বাংলাদেশেও করোনা মহামারির সময়ে শিশুদের হাসপাতালে না নেওয়া এবং ২০২৪ সালের রাজনৈতিক সহিংসতার কারণে নিয়মিত টিকাদান ব্যাহত হয়েছিল। পাশাপাশি একটি মহলের ধর্মীয় অপপ্রচারও টিকাদানের হার কমিয়ে দিয়েছে।

বর্তমানে পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার ৬ মাস থেকে ৫ বছর বয়সী শিশুদের জন্য ব্যাপক ক্র্যাশ প্রোগ্রামের মাধ্যমে টিকাদানের উদ্যোগ নিয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কেবল টিকা দিলেই হবে না, আক্রান্ত শিশুদের জটিলতা কমাতে পুষ্টি নিশ্চিত করা এবং প্রতিটি মৃত্যুর ‘ক্লিনিক্যাল অডিট’ করা এখন জরুরি।

ডিজিএন/এনএস

banner
Link copied!