রাজধানীর মিরপুরের একটি বাসা থেকে সরকারের যুগ্ম সচিব ও বুয়েট শিক্ষকের মা নূরজাহান বেগমের (৭৫) পচনধরা মরদেহ উদ্ধারের রেশ কাটতে না কাটতেই এবার পল্লবীতে আরও এক নারীর অর্ধগলিত মরদেহ উদ্ধারের খবর পাওয়া গেছে। এবার পল্লবীর একটি ফ্ল্যাট থেকে সেলিনা আফরোজ (৫৫) নামে এক নারীর গলিত মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। নিহতের স্বামী ও দুই সন্তান সবাই কানাডা প্রবাসী হলেও দীর্ঘ ১২ বছর ধরে রাজধানীর এই ফ্ল্যাটে সম্পূর্ণ একাকী ও নিঃসঙ্গ জীবন কাটাচ্ছিলেন তিনি।
গতকাল বুধবার (৩ জুন) রাতে পল্লবী ৬ নম্বর সেকশনের ১০ নম্বর রোডের ১৪ নম্বর বাসা থেকে এই হতভাগ্য নারীর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। কয়েকদিন আগে তাঁর মৃত্যু হওয়ায় মরদেহে পচন ধরেছিল বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করছে পুলিশ।
পুলিশ ও পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, নিহত সেলিনা আফরোজার বাবার নাম খলিলুর রহমান এবং মায়ের নাম আফিয়া রহমান। তিনি পল্লবীর ওই ফ্ল্যাটে একাই থাকতেন। পল্লবী থানা পুলিশ জানায়, সর্বশেষ গত ২৬ মে রাতে ভুক্তভোগী নারীর সঙ্গে তাঁর ভাতিজা আশফাকুর রহমান মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করেছিলেন। এরপর থেকে তাঁর সঙ্গে পরিবারের আর কেউ যোগাযোগ করতে পারেনি। পুলিশ ধারণা করছে, ২৬ মে থেকে ৩ জুনের মধ্যে যেকোনো সময় ঘরের ভেতর তাঁর মৃত্যু হয়। দীর্ঘদিন ধরে ঘর বন্ধ থাকায় মরদেহে পচন ধরে এবং দুর্গন্ধ ছড়াতে থাকে।
পল্লবী থানা পুলিশ ও স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, সেলিনা আফরোজ তাঁর বাবার কাছ থেকে পাওয়া ওই ফ্ল্যাটে একাই বসবাস করতেন। তাঁর স্বামী মোবিনুল হক এবং দুই সন্তান দীর্ঘদিন ধরে কানাডায় স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন। প্রায় ১২ বছর আগে তীব্র পারিবারিক কলহের জেরে তিনি কানাডা থেকে স্থায়ীভাবে বাংলাদেশে চলে আসেন। এরপর থেকে তাঁর প্রবাসী স্বামী ও সন্তানরা তাঁর কোনো খোঁজখবর নিত না। আত্মীয়-স্বজনদের সঙ্গেও তাঁর যোগাযোগ ছিল বিচ্ছিন্ন।
পল্লবী থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মো. হানিফ ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, “আমরা গতকাল রাতে খবর পেয়ে ওই ফ্ল্যাট থেকে এক নারীর অর্ধগলিত মরদেহ উদ্ধার করেছি। নিহতের স্বামী ও সন্তানরা কানাডা প্রবাসী এবং গত ১২ বছর যাবৎ তিনি ওই ফ্ল্যাটে একাই বসবাস করতেন। প্রাথমিকভাবে সুরতহাল ও ময়নাতদন্ত শেষে মরদেহটি পরিবারের (নিকট আত্মীয়) কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। এই ঘটনায় থানায় একটি অপমৃত্যু মামলা দায়েরসহ আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে।”
পল্লবীর এই মর্মান্তিক ঘটনাটি ঢাকাবাসীকে ঠিক চার দিন আগের মিরপুরের আরেকটি হৃদয়বিদারক ঘটনার কথা মনে করিয়ে দিয়েছে। গত ৩১ মে ঢাকার মিরপুর-১১ নম্বর এলাকার একটি ফ্ল্যাট থেকে ৭৫ বছর বয়সী বৃদ্ধা নূরজাহান বেগমের পচনধরা এবং পোকায় আক্রান্ত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। জাতীয় জরুরি সেবা ‘৯৯৯’ নম্বরে প্রতিবেশীদের ফোন পেয়ে পুলিশ দরজা ভেঙে ঘরে ঢুকে ওই বৃদ্ধার লাশ উদ্ধার করেছিল।
সে সময় জানা যায়, মৃত নূরজাহান বেগমের এক ছেলে সরকারের বর্তমান যুগ্ম সচিব, আরেক ছেলে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) শিক্ষক, এক ছেলে কানাডা প্রবাসী এবং এক মেয়ে স্থানীয় একটি স্কুলের শিক্ষিকা। উচ্চশিক্ষিত ও সমাজে অত্যন্ত প্রতিষ্ঠিত সন্তানরা জীবিত থাকতেও মায়ের এমন নিঃসঙ্গ ও করুণ পরিণতি দেশজুড়ে এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তীব্র ক্ষোভ, নিন্দা ও সমালোচনার ঝড় তুলেছে।
উচ্চবিত্ত ও শিক্ষিত পরিবারগুলোতে মা-বাবার প্রতি সন্তানদের এমন চরম অবহেলা এবং পারিবারিক বিচ্ছিন্নতা রাজধানী ঢাকাসহ শহুরে সমাজব্যবস্থাকে এক চরম নৈতিক ও সামাজিক সংকটের দিকে ঠেলে দিচ্ছে বলে মনে করছেন সমাজবিজ্ঞানীরা।


আপনার মতামত লিখুন :