রাজধানীর মগবাজারের আদ-দ্বীন হাসপাতালে একই রাতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ছয় নবজাতকের মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনায় প্রাথমিকভাবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব অবহেলা ও চিকিৎসা ব্যবস্থার দুর্বলতা খুঁজে পেয়েছেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তারা। আজ বুধবার (২৭ মে) দুপুরে মগবাজারের আদ-দ্বীন হাসপাতাল সরেজমিনে পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, ওই কক্ষের এসি ১ ঘণ্টা বন্ধ থাকার পর রাত ৪টা থেকে সকালের মধ্যে একের পর এক নবজাতক অসুস্থ হয়ে পড়ে এবং পরবর্তীতে তাদের মৃত্যু হয়। ঘটনা তদন্তে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পৃথক টিম কাজ শুরু করেছে।
যা ঘটেছিল সেই রাতে: আজ দুপুরে হাসপাতাল পরিদর্শন শেষে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস সাংবাদিকদের বলেন, “আমরা দুর্ঘটনাকবলিত কক্ষটি পরিদর্শন করেছি। সেখানে কর্তব্যরত সেবিকাদের একটি টিম ছিল। আমরা জানতে পেরেছি, ওই রুমে যখন কোনো শিশু অসুস্থ হয়ে পড়ে, তখন হাসপাতালের প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী তাদের চিকিৎসার জন্য পাঁচতলার এনআইসিইউতে (নবজাতক নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র) পাঠানো হয়। এই স্থানান্তর প্রক্রিয়ার জায়গাতেই আমাদের কাছে একটি বড় দুর্বলতা মনে হয়েছে, যা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষও স্বীকার করেছে। সেবার দিক থেকে বড় কোনো ত্রুটি বা গাফিলতি ছিল কি না, তা আমরা অবশ্যই গভীরভাবে খতিয়ে দেখব।”
ঘটনার বিবরণ দিয়ে মহাপরিচালক আরও বলেন, “আমরা প্রাথমিকভাবে জানতে পেরেছি, রাত ২টার দিকে কোনো একজন অভিভাবকের অনুরোধে (বাচ্চাদের ঠান্ডা লাগছে বলায়) কক্ষের এসি এক ঘণ্টার জন্য বন্ধ করা হয়। রাত ৩টায় এসি আবার চালু করার পর, ভোর ৪টার দিকে প্রথম একটি শিশু কান্নাকাটি করে অসুস্থ হয়ে পড়ে। ডিউটি নার্স তখন শিশুটিকে এনআইসিইউতে নিয়ে যান। সেখানে আধঘণ্টা পর শিশুটির অবস্থার কিছুটা উন্নতি হলে তাকে আবারও আগের সাধারণ ভিক্টিম এরিয়াতে ফিরিয়ে আনা হয়। এরপর ভোর পৌনে ৭টার দিকে নার্স খেয়াল করেন যে অন্য একটি শিশু মারা গেছে। তাকে দ্রুত এনআইসিইউতে নেওয়ার পর ধারাবাহিকভাবে বাকি সব শিশুর অবস্থাও খারাপ হতে থাকে। পরবর্তীতে সব শিশুকে এনআইসিইউতে নেওয়া হলেও অত্যন্ত দুঃখজনকভাবে কেউ বেঁচে ফেরেনি।”
চিকিৎসাজনিত জটিলতা নয়, সন্দেহ ‘টেকনিক্যাল ফল্ট’: ঘটনাস্থলে উপস্থিত স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক জাহেদ রায়হান বলেন, “পরপর ছয়টি শিশু একই সময়ে এভাবে মারা যাওয়া কোনো সাধারণ চিকিৎসাজনিত জটিলতা হতে পারে না। সাধারণ কমনসেন্স বা সাধারণ জ্ঞান দিয়েই বোঝা যায়, এক বা দুই ঘণ্টার ব্যবধানে ৬টি শিশু কেন হঠাৎ মারা গেল? আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস, এখানে বড় কোনো টেকনিক্যাল ফল্ট বা কারিগরি ত্রুটির কারণে এই ভয়াবহ ঘটনাটি ঘটেছে। এর জন্য ডাক্তার হওয়ারও প্রয়োজন নেই।”
তিনি আরও জানান, অলরেডি সিআইডির কারিগরি বিশেষজ্ঞ দল (যারা মূলত এসি এবং অন্যান্য বৈদ্যুতিক সরঞ্জামের ব্যবস্থাপনায় পারদর্শী) দুর্ঘটনাকবলিত কক্ষটি সিলগালা করে বৈজ্ঞানিক তদন্ত শুরু করেছেন। সিআইডির সেই টেকনিক্যাল রিপোর্ট আসার পর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ স্পষ্ট হবে।
অস্বাভাবিক এই মৃত্যুরহস্য উদঘাটনে আইনগতভাবে নবজাতকদের পোস্টমর্টেম (ময়নাতদন্ত) করা অত্যন্ত জরুরি হলেও, শোকাতুর অভিভাবকরা এই ছোট শিশুদের শরীরে কাটাছেঁড়া করতে দিতে সম্পূর্ণ অস্বীকৃতি জানিয়েছেন।
এ বিষয়ে অতিরিক্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক জাহেদ রায়হান বলেন, “আইনগত প্রক্রিয়া অনুযায়ী পুলিশ বা প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষ ময়নাতদন্তের প্রস্তাব দিলেও অভিভাবকরা কেউই রাজি নন। এক অভিভাবক এইটুকু এক নবজাতককে বুকে জড়িয়ে আমাকে প্রশ্ন করেছেন ‘এই বাচ্চার ওপর কাটাছেঁড়া কোথায় করবেন আপনারা?’ আমি ওনাকে উত্তর দিতে পারিনি। মানবিক কারণে বিষয়টি আমরা অভিভাবকদের ওপরই ছেড়ে দিতে চাই।”
আইনি জটিলতার বিষয়ে তিনি স্পষ্ট করেন, “আমরা ডিসি (রমনা) মহোদয়ের সঙ্গে কথা বলেছি। ময়নাতদন্ত হলে সবচেয়ে ভালো হতো, তবে তা না হলেও পারিপার্শ্বিক তথ্য-প্রমাণ ও সিআইডির টেকনিক্যাল রিপোর্টের ওপর ভিত্তি করেই এই তদন্তের গতিপথ নির্ধারিত হবে এবং এই মামলা আইন ও আদালতের সর্বোচ্চ পর্যায় পর্যন্ত যাবে। অপরাধী যেই হোক, ছাড় দেওয়া হবে না।”
হৃদয়বিদারক এই ঘটনার পর মগবাজারের আদ-দ্বীন হাসপাতাল এলাকায় স্তব্ধতা ও নিস্তব্ধতা নেমে এসেছে। নিহত শিশুদের পরিবারগুলোর আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছে হাসপাতালের চারপাশ। তদন্তের মাধ্যমে যথাযথ বিচার নিশ্চিতের দাবি জানিয়েছেন সাধারণ মানুষ।


আপনার মতামত লিখুন :