ঢাকার ফুটপাত নিয়ে আলোচনা নতুন কিছু নয়। বছরের পর বছর ধরে এই শহরের পথচারীরা হাঁটার অধিকার হারিয়েছে, আর ফুটপাত ধীরে ধীরে পরিণত হয়েছে দোকান, ভ্যান, পার্কিং আর দখলের এক বিশৃঙ্খল ক্ষেত্র। এমন বাস্তবতায় এখন শোনা যাচ্ছে নতুন এক প্রস্তাব রাস্তা ও ফুটপাত মার্কিং করে হকারদের জন্য নির্দিষ্ট জায়গা বরাদ্দ দেওয়া হবে। শুনতে এটি ভারসাম্যপূর্ণ সমাধান মনে হতে পারে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, ঢাকার মতো দখলপ্রবণ শহরে এই মার্কিং কি সত্যিই সমস্যার সমাধান করবে, নাকি শুধু অবৈধ দখলকে আরেকটু শৃঙ্খলিত নাম দেবে?
প্রথমেই একটি সত্য স্বীকার করা দরকার হকাররা অপরাধী নন। তারা জীবিকার তাড়নায় ফুটপাতে বসেন। অনেকেরই পেছনে থাকে পরিবার, ঋণের চাপ, অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ। তাই হকারদের বিরুদ্ধে কেবল দমননীতি নিয়ে এগোলে সমাধান আসবে না। তাদের জন্য সহানুভূতি দরকার, বিকল্প দরকার, পুনর্বাসন দরকার। কিন্তু একই সঙ্গে আরেকটি সত্যও অনস্বীকার্য ফুটপাত হকারের দোকান নয়; ফুটপাত পথচারীর পথ।
ফুটপাতের মৌলিক অর্থই হলো মানুষের হাঁটার জায়গা। সেখানে দোকান বসানো, ভ্যান দাঁড় করানো, পার্কিং করা, কিংবা অস্থায়ী বাণিজ্য চালানো সবকিছুই সেই সংজ্ঞার বিরুদ্ধে। ঢাকা শহরের অনেক এলাকায় এই বাস্তবতা এতই নষ্ট হয়ে গেছে যে পথচারীরা ফুটপাত ছেড়ে রাস্তায় হাঁটতে বাধ্য হন। আর সেখানেই দুর্ঘটনার ঝুঁকি, যানজটের চাপ, আর নগরজীবনের ভাঙন শুরু হয়।
এখন যদি সরকার বলে, “আমরা মার্কিং করে দিব, কোথায় হকার বসবে,” তাহলে আপাতদৃষ্টিতে এটি শৃঙ্খলার মতো মনে হতে পারে। কিন্তু আসল প্রশ্ন হলো, এই শৃঙ্খলা কে ধরে রাখবে? ঢাকার প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা বলছে, যেখানে ফুটপাত পুরোপুরি দখলমুক্ত রাখা যায় না, সেখানে অর্ধেক ফুটপাত হকারদের জন্য নির্ধারণ করলে সেটি অল্পদিনেই আরও বড় দখলে পরিণত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। আজ পাঁচ ফুট, কাল সাত ফুট; আজ এক সারি, কাল দুই সারি; আর শেষ পর্যন্ত পথচারীর জন্য আর কিছুই থাকবে না।
এই নীতির আরেকটি বড় দুর্বলতা হলো, এটি অবৈধকে আংশিক বৈধতা দেয়। একবার যদি বার্তা যায় যে ফুটপাতের একটি অংশ সরকারই হকারদের জন্য “দিয়েছে”, তখন আরও অনেকেই একই অধিকারের দাবি তুলবে। ভ্যানচালক বলবে, আমিও বসব। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী বলবে, আমাকেও জায়গা দেন। ফলে যে ফুটপাতকে নিয়ন্ত্রণ করার কথা, সেটিই হয়ে উঠবে নতুন দখলের বৈধ মঞ্চ।
ঢাকার ফুটপাত সংকটের মূল কারণ দখলদারির পাশাপাশি সমন্বয়হীন নগরব্যবস্থা। একদিকে নগর কর্তৃপক্ষ চায় ফুটপাত খালি থাকুক, অন্যদিকে হকারদের পুনর্বাসনের কোনো স্থায়ী পরিকল্পনা নেই। ফলে দখল উচ্ছেদ হয়, আবার দখল ফিরে আসে। অভিযান হয়, কিন্তু পুনর্বাসন হয় না। আর এই চক্রের ভেতরেই সাধারণ মানুষ প্রতিদিন ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
আসল সমাধান মার্কিং নয়, পুনর্বাসন। হকারদের জন্য আলাদা বাজার, নির্দিষ্ট হকার সেন্টার, নাইট মার্কেট বা কমিউনিটি মার্কেট তৈরি করতে হবে। সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড বা মালয়েশিয়ার মতো দেশে হকারদের বাণিজ্যিক অস্তিত্ব আছে, কিন্তু ফুটপাত দখল নেই, কারণ সেখানে সরকার বিকল্প বাজারব্যবস্থা তৈরি করেছে, শাস্তি দিয়েছে, আর নিয়ম প্রয়োগ করেছে। হকারকে সরিয়ে দেওয়া নয়, তাকে বসার সঠিক জায়গা দেওয়া হলো আসল কৌশল।
তবে ফুটপাত নিয়ে সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো রাজনৈতিক সদিচ্ছা। ফুটপাত শুধু “মার্কিং” করে বাঁচানো যাবে না, যদি আইন প্রয়োগে কঠোরতা না থাকে। যেদিন একটি দখলকে অনুমোদন দেওয়া হবে, সেদিনই দখলদারিত্বের নতুন ভাষা শুরু হবে। আর যদি নিয়ম ভেঙে কেউ ফুটপাত দখল করে, তাকে জরিমানা, উচ্ছেদ ও জবাবদিহির মুখে পড়তে হবে কথায় নয়, কাজে।
একই সঙ্গে পথচারীদের অধিকারকেও সামাজিকভাবে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। মানুষ যদি মনে করে ফুটপাত তাদের নয়, তাহলে দখলদারও জিতে যাবে। তাই নাগরিকদেরও দাঁড়াতে হবে নিজের হাঁটার অধিকারের পক্ষে। ফুটপাতের ওপর দিয়ে হাঁটা কেবল চলাচল নয়; এটি নাগরিক মর্যাদার প্রশ্ন।
ঢাকা শহরকে যদি সত্যিই বাসযোগ্য করতে হয়, তবে অস্থায়ী কৌশল দিয়ে নয়, স্থায়ী নীতিতে এগোতে হবে। হকারদের জন্য জায়গা চাই অবশ্যই। কিন্তু সেই জায়গা ফুটপাত নয়। পথচারীর হাঁটার পথকে আবার পথচারীর হাতে ফিরিয়ে দিতে হবে। নগর যদি সবার হয়, তবে সবাইকে তার নির্দিষ্ট জায়গায় থাকতে হবে।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি খুব সহজ, কিন্তু জবাব কঠিন ঢাকা কি শৃঙ্খলার শহর হবে, নাকি দখলের শহরই থেকে যাবে? মার্কিং হয়তো সাময়িক স্বস্তি দিতে পারে, কিন্তু পরিকল্পনা ছাড়া তা নতুন জটের জন্মও দিতে পারে। তাই দরকার সাহসী সিদ্ধান্ত, বিকল্প বাজার, কঠোর প্রয়োগ, আর নাগরিক অধিকারকে প্রাধান্য দেওয়া। নইলে আজ যে জায়গাটি মার্কিং করা হচ্ছে, কাল সেটিই আবার আরেক দখলের নাম হয়ে দাঁড়াবে।
লেখক: গণমাধ্যমকর্মী


আপনার মতামত লিখুন :