ঢাকা সোমবার, ২৫ মে, ২০২৬, ১০ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
Daily Global News

শিক্ষা বদলের নতুন দর্শন: মুখস্থবিদ্যা থেকে দক্ষতা নির্ভর ভবিষ্যতের পথে বাংলাদেশ

ওমর ফারুক

প্রকাশিত: মে ১২, ২০২৬, ০১:২০ পিএম

শিক্ষা বদলের নতুন দর্শন: মুখস্থবিদ্যা থেকে দক্ষতা নির্ভর ভবিষ্যতের পথে বাংলাদেশ

বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে বহু বছর ধরেই একটি প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে আমরা কি সত্যিই ভবিষ্যতের জন্য শিক্ষার্থী তৈরি করছি, নাকি শুধু পরীক্ষার খাতায় নম্বর তোলার যন্ত্র বানাচ্ছি? প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা এবং দ্রুত বদলে যাওয়া চাকরির বাজারের এই সময়ে দাঁড়িয়ে সেই প্রশ্ন এখন আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী জানিয়েছেন, সরকার পুরো শিক্ষা ব্যবস্থাকে আধুনিক ও বাস্তবমুখী করার লক্ষ্যে কাজ করছে। বক্তব্যটি নিছক রাজনৈতিক ঘোষণা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। কারণ বাস্তবতাও এখন সেটিই দাবি করছে। শুধু পাঠ্যবইভিত্তিক জ্ঞান নয়, বরং দক্ষতা, উদ্ভাবনী ক্ষমতা, প্রযুক্তি ব্যবহার এবং বাস্তব সমস্যার সমাধান করার সক্ষমতাই আগামী পৃথিবীতে সবচেয়ে বড় শক্তি হতে যাচ্ছে।

বাংলাদেশের প্রচলিত শিক্ষা কাঠামোর সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা হলো এটি এখনও বড় অংশে মুখস্থনির্ভর। একজন শিক্ষার্থী বছরের পর বছর পড়ে, পরীক্ষা দেয়, ভালো ফল করে; কিন্তু বাস্তব জীবনের সমস্যা সমাধান, যোগাযোগ দক্ষতা কিংবা প্রযুক্তিগত অভিযোজনের জায়গায় পিছিয়ে থাকে। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি হাতে নিয়েও অনেক তরুণ চাকরির বাজারে এসে হতাশ হয়। একদিকে বেকারত্ব বাড়ছে, অন্যদিকে দক্ষ জনবলের অভাবে বিভিন্ন খাত বিদেশি কর্মীর ওপর নির্ভর করছে। এটি নিঃসন্দেহে এক ধরনের বৈপরীত্য।

আধুনিক শিক্ষা বলতে শুধু স্মার্ট ক্লাসরুম বা ডিজিটাল বোর্ড বোঝায় না। আধুনিক শিক্ষা মানে এমন একটি ব্যবস্থা, যেখানে শিক্ষার্থী শুধু “কি” শিখবে তা নয়, “কিভাবে” শিখবে সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। বাস্তবমুখী শিক্ষা মানে এমন পাঠ্যক্রম, যা শিক্ষার্থীকে জীবনের সঙ্গে সংযুক্ত করবে। কৃষি পড়া শিক্ষার্থী মাঠ চিনবে না, ব্যবসা পড়া শিক্ষার্থী বাজার বিশ্লেষণ জানবে না, কিংবা কম্পিউটার সায়েন্স পড়া শিক্ষার্থী বাস্তব সফটওয়্যার তৈরি করতে পারবে না এমন শিক্ষা কাঠামো টেকসই হতে পারে না।

সরকার ইতোমধ্যে কারিগরি ও প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষার ওপর গুরুত্ব বাড়ানোর কথা বলছে। এটি ইতিবাচক দিক। কারণ ভবিষ্যতের পৃথিবীতে শুধু সনদ নয়, দক্ষতাই হবে সবচেয়ে বড় পরিচয়। বিশ্ব অর্থনীতি এখন দ্রুত অটোমেশন ও এআই নির্ভর হয়ে উঠছে। আগামী দশ বছরে বহু প্রচলিত চাকরি হারিয়ে যাবে, আবার নতুন ধরনের অসংখ্য পেশার জন্ম হবে। সেই বাস্তবতায় শিক্ষার্থীদের প্রস্তুত করতে না পারলে একটি প্রজন্ম বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা থেকে ছিটকে পড়তে পারে।

তবে বাস্তবতা হলো, শিক্ষা সংস্কার শুধু নীতিমালা ঘোষণায় সফল হয় না। এর জন্য প্রয়োজন শিক্ষক প্রশিক্ষণ, অবকাঠামোগত উন্নয়ন, গবেষণাভিত্তিক পাঠ্যক্রম এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছার ধারাবাহিকতা। বাংলাদেশের বহু স্কুল-কলেজ এখনও মৌলিক প্রযুক্তিগত সুবিধা থেকে বঞ্চিত। অনেক জায়গায় ইন্টারনেট নেই, পর্যাপ্ত ল্যাব নেই, দক্ষ শিক্ষকও নেই। ফলে শহর ও গ্রামের শিক্ষার্থীদের মধ্যে বৈষম্য আরও বেড়ে যাচ্ছে।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, শিক্ষাকে শুধু চাকরিমুখী করলেই হবে না, মানবিক ও নৈতিক ভিত্তিও শক্তিশালী করতে হবে। প্রযুক্তি জানে কিন্তু মানবিক মূল্যবোধ জানে না এমন প্রজন্মও সমাজের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। তাই আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থায় বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও দক্ষতার পাশাপাশি মানবিকতা, সহনশীলতা, পরিবেশ সচেতনতা এবং নাগরিক দায়িত্ববোধও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ হওয়া উচিত।

বাংলাদেশ এখন জনমিতিক সুবিধার একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়ে দাঁড়িয়ে আছে। দেশের বিপুল তরুণ জনগোষ্ঠীকে যদি দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তর করা যায়, তবে অর্থনীতি, শিল্প, প্রযুক্তি সব খাতেই বড় পরিবর্তন সম্ভব। আর সেই পরিবর্তনের মূল চাবিকাঠি শিক্ষা।

প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য তাই একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত বহন করে। কিন্তু এই পরিবর্তনের সাফল্য নির্ভর করবে বাস্তবায়নের ওপর। শিক্ষা যদি সত্যিকার অর্থেই আধুনিক ও বাস্তবমুখী করা যায়, তাহলে শুধু শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ নয়, বদলে যেতে পারে পুরো বাংলাদেশের ভবিষ্যৎও।

লেখক: গণমাধ্যমকর্মী

ডিজিএন/এনএস

banner
Link copied!