রাস্তায় গোলাগুলি, চলমান ট্যাংক, সরকারি ভবনের ওপর নিচু দিয়ে উড়ে যাওয়া যুদ্ধবিমান আর খোদ সংসদ ভবনে হামলা ২০১৬ সালের ১৫ই জুলাইয়ের রাতটি আধুনিক তুরস্কের ইতিহাসে এক নজিরবিহীন ও রক্তক্ষয়ী অধ্যায় হিসেবে লেখা রয়েছে। তিনটি সামরিক অভ্যুত্থান এবং আরও দুটি হস্তক্ষেপের অভিজ্ঞতা থাকা দেশটির ইস্তাম্বুলের বিখ্যাত বসফরাস সেতু, যা এখন ১৫ই জুলাই শহীদ সেতু নামে পরিচিত, সে রাতে অভূতপূর্ব রক্তপাতের সাক্ষী হয়েছিল।
অজ্ঞাত স্থান থেকে মোবাইল ফোনের অ্যাপের মাধ্যমে প্রেসিডেন্ট রেচেপ তাইয়েপ এরদোয়ানের এক আহ্বানে সাধারণ মানুষ সেদিন অভ্যুত্থানকারীদের প্রতিরোধে রাজপথে নেমে এসেছিল। সকালের মধ্যেই ব্যর্থ হওয়া সেই অভ্যুত্থানচেষ্টায় ১৮৪ জন বেসামরিক নাগরিক ও ৩৪ জন ষড়যন্ত্রকারীসহ মোট ২৫৩ জন নিহত হন। অভ্যুত্থানচেষ্টাটি মাত্র কয়েক ঘণ্টা স্থায়ী হলেও এর সুদূরপ্রসারী পরিণতি গত এক দশকে তুরস্কের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতা কাঠামো ও পররাষ্ট্রনীতিকে সম্পূর্ণ ঢেলে সাজিয়েছে।
সরকার এই অভ্যুত্থানচেষ্টার জন্য যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ইসলামপন্থি ধর্মগুরু ফেতুল্লাহ গুলেনের নেটওয়ার্ককে সরাসরি দায়ী করে, যদিও ২০২৪ সালে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত গুলেন এই অভিযোগ অস্বীকার করে গেছেন। অভ্যুত্থানের পর পরই তুরস্কে জরুরি অবস্থা জারি করা হয়, যা ২০১৮ সাল পর্যন্ত বহাল ছিল। এই সময়ে তুরস্কের আধুনিক ইতিহাসের সবচেয়ে বড় শুদ্ধি অভিযান পরিচালনা করা হয়।
একসময় এরদোয়ানের ঘনিষ্ঠ মিত্র থাকা গুলেন নেটওয়ার্কের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে হাজার হাজার উচ্চপদস্থ সামরিক কর্মকর্তা, বিচারক, প্রসিকিউটর, পুলিশ ও শিক্ষাবিদকে বরখাস্ত বা কারাবন্দি করা হয় এবং শত শত বেসরকারি স্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয় চিরতরে বন্ধ করে দেওয়া হয়। সমালোচকরা দাবি করেন, এই দমন অভিযান শুধু কথিত অভ্যুত্থানকারীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং এটি আরও বিস্তৃতভাবে ভিন্নমত দমনে ব্যবহৃত হয়েছে এবং এর ফলে রাষ্ট্রযন্ত্রে নতুন কিছু ধর্মীয় সম্প্রদায়ের প্রভাব বেড়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, অভ্যুত্থানচেষ্টার সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক প্রভাব ছিল প্রেসিডেন্ট এরদোয়ানের হাতে ক্ষমতার একচ্ছত্র কেন্দ্রীকরণ। ২০১৭ সালের এক সাংবিধানিক গণভোটের মাধ্যমে সংসদীয় ব্যবস্থা বাতিল করে শক্তিশালী নির্বাহী রাষ্ট্রপতিশাসিত ব্যবস্থা চালু করা হয়, যেখানে প্রধানমন্ত্রীর পদ বিলুপ্ত করে প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা ব্যাপক হারে বাড়ানো হয়। ইস্তাম্বুল বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক দোগান চেতিনকায়ার মতে, ১৫ই জুলাইয়ের পর তুরস্কের প্রশাসনিক ও বিচারিক প্রতিষ্ঠানগুলো সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ে এবং তারা তাদের স্বায়ত্তশাসন হারায়।
যুক্তরাষ্ট্রের গবেষণা সংস্থা ফ্রিডম হাউজের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাংবিধানিক পরিবর্তন ও স্বাধীন সাংবাদিকদের কারাবন্দি করার মাধ্যমে তুরস্ক গত এক দশকে আরও কর্তৃত্ববাদী হয়ে উঠেছে। এমনকি ২০২৫ সালের মার্চে এরদোয়ানের অন্যতম প্রতিদ্বন্দ্বী ইস্তাম্বুলের মেয়র একরেম ইমামোগলুকে দুর্নীতিসংক্রান্ত অভিযোগে গ্রেফতার এবং প্রধান বিরোধী দল সিএইচপি-এর নেতৃত্বে বিচারিক হস্তক্ষেপ বিরোধীদের সেই দাবির পালেই হাওয়া দিচ্ছে।
দশকের পর দশক ধরে ধর্মনিরপেক্ষ প্রজাতন্ত্রের অভিভাবক হিসেবে রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করা তুর্কি সামরিক বাহিনীর ভূমিকা ১৫ই জুলাইয়ের পর সম্পূর্ণ বদলে যায়। ধারাবাহিক কাঠামোগত সংস্কারের মাধ্যমে সশস্ত্র বাহিনীকে কঠোরভাবে বেসামরিক সরকারের নিয়ন্ত্রণের অধীনে আনা হয়।
ইয়িলদিরিম বেয়াজিত বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক নুরি সালিক বলেন, আধুনিক তুর্কি ইতিহাসে সেদিনই প্রথমবারের মতো সাধারণ মানুষ সক্রিয়ভাবে সামরিক হস্তক্ষেপ প্রতিরোধ করেছিল। এর মাধ্যমে তুর্কি রাজনীতিতে সামরিক বাহিনীর হস্তক্ষেপ করার বা গভীরভাবে প্রভাবিত করার সক্ষমতার পুরোপুরি অবসান ঘটেছে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।
ব্যর্থ অভ্যুত্থানচেষ্টা তুর্কি রাষ্ট্রের ভেতরের নিরাপত্তাকেন্দ্রিক নীতিকে আরও বেশি শক্তিশালী করেছে, যার প্রভাব পড়েছে পররাষ্ট্রনীতিতেও। জাতীয় সুরক্ষাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে আঙ্কারা উত্তর সিরিয়ায় কুর্দি সশস্ত্র গোষ্ঠী ওয়াইপিজি এবং ইসলামিক স্টেটের বিরুদ্ধে অন্তত তিনটি বড় ধরনের সামরিক অভিযান চালিয়েছে।
অন্যদিকে, ন্যাটোর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হওয়া সত্ত্বেও তুরস্ক যুক্তরাষ্ট্রের আপত্তি উপেক্ষা করে রাশিয়ার কাছ থেকে এস-৪০০ আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কিনেছে। এর জেরে ওয়াশিংটন নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে এবং তুরস্ককে এফ-থার্টিফাইভ যুদ্ধবিমান কর্মসূচি থেকে বাদ দেয়। যদিও সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সেই নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের ইঙ্গিত দিয়েছেন, তবে তা কংগ্রেসে বিরোধিতার মুখে পড়তে পারে। একই সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়নে তুরস্কের যোগ দেওয়ার দীর্ঘদিনের স্বপ্নও ২০১৮ সাল থেকে কার্যত স্থগিত হয়ে রয়েছে, যা আঙ্কারার নতুন এই বৈচিত্র্যময় পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম এক চ্যালেঞ্জ। সূত্র: বিবিসি


আপনার মতামত লিখুন :