দীর্ঘ ১৮ মাসের অপেক্ষা আর সংস্কারের চড়াই-উতরাই পেরিয়ে আগামীকাল বৃহস্পতিবার (১২ ফেব্রুয়ারি) অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও ‘জুলাই সনদ’ গণভোট। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার বিপ্লব-পরবর্তী বাংলাদেশে এটিই প্রথম সাধারণ নির্বাচন, যা একটি বৈষম্যহীন ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠনের পথে চূড়ান্ত ধাপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
সকাল সাড়ে ৭টা থেকে বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত ২৯৯টি সংসদীয় আসনে বিরতিহীনভাবে চলবে এই ভোটগ্রহণ। মোট ১২ কোটি ৭৭ লাখ ১১ হাজার ৮৯৩ জন ভোটার নির্ধারণ করবেন তাঁদের আগামীর প্রতিনিধি। নির্বাচনে ৫০টি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের ২ হাজার ২৮ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। মাঠের প্রধান শক্তি হিসেবে বিএনপি ২৯১ আসনে লড়ছে, যাদের নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে রয়েছে ১১ দলীয় জোট (জামায়াত-এনসিপি) ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ।
সংসদ নির্বাচন ও গণভোট: এবারের নির্বাচনের সবচেয়ে বড় বিশেষত্ব হলো প্রতিটি ভোটারকে কেন্দ্রে দুটি ব্যালট পেপার দেওয়া হবে, সাদা ব্যালট- সংসদ সদস্য নির্বাচনের জন্য। গোলাপি ব্যালট- সংবিধান সংস্কারের প্রস্তাবিত ‘জুলাই সনদ’ এর পক্ষে বা বিপক্ষে ‘হ্যাঁ/না’ ভোটের জন্য।
বাংলাদেশের ৫৪ বছরের ইতিহাসে এই প্রথম আওয়ামী লীগকে ছাড়াই কোনো সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। জুলাই-আগস্টের ‘গণহত্যা’ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে দলটির কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষণা এবং আইনি জটিলতায় তারা এই নির্বাচনে অংশগ্রহণের অযোগ্য বিবেচিত হয়েছে।
ইতিহাসে প্রথমবারের মতো প্রবাসীদের জন্য ‘পোস্টাল ভোট বিডি’ অ্যাপের মাধ্যমে পূর্ণাঙ্গ ভোটাধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। ইতোমধ্যে প্রায় ১৫ লাখের বেশি পোস্টাল ব্যালট সংগৃহীত হয়েছে, যা আগামীকাল মূল গণনার সঙ্গে যুক্ত হবে। ই-কেওয়াইসি ও ফেসিয়াল ভেরিফিকেশন ব্যবহারের ফলে এই প্রক্রিয়ায় জালিয়াতি রোধ করা সম্ভব হয়েছে।
নির্বাচনের নিরাপত্তায় দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ ৯ লাখ ৫৮ হাজার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। সেনাবাহিনী: ১ লাখ ৩ হাজার সদস্য। অন্যান্য: পুলিশ (১.৮৭ লাখ), আনসার (৫.৬৭ লাখ), বিজিবি (৩৭ হাজার) ও র্যাব (৯ হাজার)।
প্রযুক্তি: প্রথমবারের মতো নির্বাচনী নজরদারিতে ড্রোন ও ইউএভি ব্যবহার করা হচ্ছে।
যানবাহন চলাচলে বিধিনিষেধ: আজ রাত ১২টা থেকে আগামীকাল রাত ১২টা পর্যন্ত ট্যাক্সি, পিকআপ, মাইক্রোবাস ও ট্রাক চলাচলে নিষেধাজ্ঞা থাকছে। মোটরসাইকেল চলাচল ১৩ ফেব্রুয়ারি রাত ১২টা পর্যন্ত বন্ধ থাকবে। তবে জরুরি সেবা ও পরিচয়পত্রধারী সংবাদিকদের যানবাহন এই নিষেধাজ্ঞার আওতামুক্ত।
প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিন ভোটারদের আশ্বস্ত করে বলেছেন, “একটি উৎসবমুখর ও নিরাপদ পরিবেশে ভোট হবে। আপনারা নির্ভয়ে কেন্দ্রে আসুন এবং পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিন।”
দীর্ঘ সংস্কার যাত্রার পর কালকের সূর্যোদয় নির্ধারণ করবে বাংলাদেশের আগামীর রাজনৈতিক গতিপথ। ব্যালট বিপ্লবের মাধ্যমে একটি স্থিতিশীল ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের প্রত্যাশায় এখন প্রহর গুনছে গোটা জাতি।


আপনার মতামত লিখুন :