ঢাকা শনিবার, ৩০ মে, ২০২৬, ১৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
Daily Global News

তারেক রহমান সরকারের ১০০ দিন: শঙ্কা ও সম্ভাবনার মাঝে নতুন প্রশাসন

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: মে ২৭, ২০২৬, ০৮:৫৭ এএম

তারেক রহমান সরকারের ১০০ দিন: শঙ্কা ও সম্ভাবনার মাঝে নতুন প্রশাসন

একটি বড় ধরনের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও তীব্র মেরুকরণের মধ্য দিয়ে চলতি বছরের ১৭ ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রক্ষমতার দায়িত্ব নিয়েছিল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার। নানা রাজনৈতিক অচলাবস্থা, ভঙ্গুর অর্থনীতি, নড়বড়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং গভীর সামাজিক বিভাজনের মাঝে গঠিত তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন এই সরকারের প্রথম ১০০ দিন পূর্ণ হয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, মাত্র ১০০ দিনের মাথায় একটি পাঁচ বছর মেয়াদি সরকারের সামগ্রিক সফলতা বা ব্যর্থতার চূড়ান্ত মূল্যায়ন সম্ভব না হলেও, নতুন সরকারের শুরুটা কেমন হলো তার একটি নীতিগত ও কাঠামোগত রূপরেখা এর মধ্যেই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। এই সময়কালকে মূলত ‘ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্ট’ বা সংকট ব্যবস্থাপনার পিরিয়ড হিসেবেই দেখছেন তারা।

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত ১০০ দিনে সরকারের প্রশাসনিক গতিশীলতা সন্তোষজনক। প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও মুখপাত্র মাহদী আমিন এক সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছেন, এ পর্যন্ত মন্ত্রিসভার ১০টি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। যেখানে গৃহীত ৬০টি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের মধ্যে ইতোমধ্যে প্রায় ৬২ শতাংশ (৩৭টি সিদ্ধান্ত) বাস্তবায়িত হয়েছে। এছাড়া প্রতিটি মন্ত্রণালয়কে ১৮০ দিনের বিশেষ কর্মপরিকল্পনা প্রণয়নের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

নতুন সরকারের জন্য প্রথম ১০০ দিনে সবচেয়ে কঠিন ও জটিল পরীক্ষা ছিল দেশের ধসে পড়া অর্থনৈতিক খাতকে টেনে তোলা। ব্যাংক খাতের সংস্কার, লাগামহীন মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং নিত্যপণ্যের দাম সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রাখাই ছিল সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ-এর সম্মাননীয় ফেলো অর্থনীতিবিদ ড. মোস্তাফিজুর রহমান বিবিসি বাংলাকে বলেন: “সরকার ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক ঋণের মাধ্যমে সামাজিক নিরাপত্তা খাতে নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি পূরণের ইতিবাচক বার্তা দিয়েছে। তবে রেভিনিউ বা রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা এবারও পূরণ হবে না। সরকার ব্যাংক থেকে বড় অঙ্কের ঋণ নিচ্ছে সব মিলিয়ে আগের পুঞ্জীভূত সমস্যাগুলো এখনও অব্যাহত আছে, কিছু কিছু জায়গায় আরও ঘনীভূত হয়েছে। বেসরকারি খাতে বিনিয়োগেও সংকোচন দেখা যাচ্ছে।”

তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর নিয়োগ এবং ব্যাংকিং আইনের সংশোধনসহ বেশ কিছু নীতিগত সিদ্ধান্ত শুরুতেই নতুন সরকারকে সমালোচনার মুখে ফেলেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতার বিষয়ে সরকারের যে রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি ছিল, তা এখনও বিশেষজ্ঞদের কাছে স্পষ্ট নয়। তবে এই সময়ে রেমিট্যান্স বা প্রবাসী আয়ের ইতিবাচক প্রবাহ সরকারকে কিছুটা স্বস্তি দিচ্ছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, আসন্ন জাতীয় বাজেটেই বোঝা যাবে অর্থনীতি নিয়ে নতুন সরকারের আসল অগ্রাধিকার ও দীর্ঘমেয়াদি রোডম্যাপ কী।

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় থেকে শুরু হওয়া ‘মব ভায়োলেন্স’ বা গণপিটুনির মতো আইনবহির্ভূত সহিংসতা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনা বর্তমান রাজনৈতিক সরকারের জন্যও বড় মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। মাঠ পর্যায় থেকে সেনাবাহিনীকে ধাপে ধাপে সরিয়ে নেওয়া হলেও চুরি, ছিনতাই, মাদক ও চাঁদাবাজির মতো অপরাধ সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন উদ্বেগের কারণ হয়ে রয়েছে।

নিরাপত্তা বিশ্লেষক ড. নাসির উদ্দিন আহাম্মেদ পুলিশের বর্তমান ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলে বলেন, “নারী ও শিশু নির্যাতন এবং ধর্ষণের মতো ঘটনাগুলো এখনও বন্ধ করা যায়নি। সম্প্রতি কালশী থেকে পুলিশ যেভাবে দৌড়ে পলায়ন করেছে, তা খুবই দৃষ্টিকটু ছিল। এর অর্থ পুলিশ এখনও তাদের পেশাদারিত্ব ও পূর্ণ সক্ষমতায় ফিরতে পারেনি।”

এছাড়া বিএনপির দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক এজেন্ডা ‘র‌্যাব বিলুপ্তিকরণ’ থেকে সরে এসে সংস্থাটিকে একটি আইনি কাঠামোর আওতায় এনে পুনর্গঠনের সরকারি পরিকল্পনা নিয়েও নানা মহলে আলোচনা চলছে। তবে মব ভায়োলেন্সের বিরুদ্ধে সরকারের সাম্প্রতিক কঠোর অবস্থান এবং মেহেরপুরের একটি ধর্ষণ মামলায় মাত্র ২৯ কার্যদিবসের মধ্যে মৃত্যুদণ্ডের রায় ও পল্লবীর শিশু রামিসা হত্যা মামলায় দ্রুততম সময়ে (৫ দিনে) চার্জশিট দাখিলকে বিচারহীনতার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসার ইতিবাচক লক্ষণ হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক সিদ্দিকুর রহমান খান মনে করেন, সরকার শুরু থেকেই সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি দিয়ে ‘এক ঢিলে দুই পাখি’ মারার কৌশল নিয়েছে। ফ্যামিলি কার্ড ও ডিজিটাল ‘কৃষক কার্ড’ চালুর মাধ্যমে সাধারণ মানুষের সমর্থন ধরে রাখার পাশাপাশি তারা রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকেও কাউন্টার মেসেজ দিচ্ছে। তাছাড়া, পাচার হওয়া অর্থ ফিরিয়ে আনতে আন্তর্জাতিক চুক্তি স্বাক্ষর এবং এস আলম গ্রুপের প্রায় ৪,২৬৪ কোটি টাকার সম্পদ জব্দের মাধ্যমে দুর্নীতির বিরুদ্ধে নিজেদের শক্ত অবস্থান জানান দিয়েছে নতুন প্রশাসন।

তবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন থেকেই ‘জুলাই সনদ’ এবং ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’ গঠন নিয়ে বিরোধী দলগুলোর তীব্র বিরোধিতার মুখে পড়তে হয়েছে সরকারকে। বিরোধীরা ইতোমধ্যেই সংসদের বাইরে রাজপথে আন্দোলনের ঘোষণা দিয়েছে।

এর পাশাপাশি গত দুই মাস ধরে দেশজুড়ে মহামারি আকারে চেপে বসা ‘হাম পরিস্থিতি’ নতুন সরকারকে বেশ ভুগিয়েছে। হাম ও হামের উপসর্গে ইতোমধ্যে ৫শর বেশি শিশুর মৃত্যু সরকারের স্বাস্থ্য খাতের দুর্বলতা প্রকাশ করেছে। যদিও সরকার পরিস্থিতি মোকাবিলায় জরুরি ভিত্তিতে ৬০৪ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়ে দেশব্যাপী ব্যাপক টিকাদান কর্মসূচি শুরু করেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, তারেক রহমানের সরকারের প্রথম ১০০ দিনে প্রশাসনিক সদিচ্ছা ও কিছু জনবান্ধব উদ্যোগ দেখা গেলেও, দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ফিরিয়ে আনা, খেলাপি ঋণ কমানো, বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরানো এবং বাজার সিন্ডিকেট ভেঙে নিত্যপণ্যের দাম কমানোর ওপরই নির্ভর করছে এই সরকারের আগামী দিনগুলোর আসল স্থায়িত্ব ও জনপ্রিয়তা।

ডিজিএন/এনএস

banner
Link copied!