সাম্প্রতিক সময়ে কয়েক দফা ভারী বর্ষণের পর জলাবদ্ধতায় বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিল কুমিল্লা নগরীর বিভিন্ন এলাকা। প্রধান সড়ক, আবাসিক এলাকা এবং গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আশপাশে পানি জমে থাকায় স্বাভাবিক জনজীবন ব্যাহত হয়েছে। সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন শিক্ষার্থী, কর্মজীবী মানুষ এবং ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা। সাম্প্রতিক পরিস্থিতি নগরীর ড্রেনেজ ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, অল্প সময়ের ভারী বৃষ্টিতেই নগরীর বিভিন্ন এলাকায় হাঁটু থেকে কোমরসমান পানি জমে যায়। অনেক বাসা-বাড়ি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে পানি ঢুকে ক্ষয়ক্ষতির ঘটনাও ঘটেছে। সড়কে পানি জমে থাকায় যান চলাচল ব্যাহত হওয়ায় অফিসগামী মানুষ, শিক্ষার্থী এবং জরুরি সেবাগ্রহীতাদের চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। অনেক এলাকায় রিকশা ও ছোট যানবাহন চলাচলও সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যায়।
জলাবদ্ধতার কারণে সাম্প্রতিক সময়ে পরীক্ষার্থীরাও দুর্ভোগে পড়েন। অনেক শিক্ষার্থীকে পানি মাড়িয়ে পরীক্ষাকেন্দ্রে যেতে হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও নগরীর বিভিন্ন এলাকার জলাবদ্ধতার ছবি ও ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে, যা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। মূলত কুমিল্লা সরকারি মহিলা কলেজ কেন্দ্রে জলাবদ্ধতার মধ্যে এবং চট্টগ্রাম অঞ্চলের বন্যা পরিস্থিতির মধ্যেও এইচএসসি পরীক্ষা গ্রহণের সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে শিক্ষার্থীদের মধ্যে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। এরই ধারাবাহিকতায় সাম্প্রতিক সময়ে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ, দুর্যোগ পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত পরীক্ষা স্থগিত এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরীক্ষার্থীদের জন্য পুনঃপরীক্ষার দাবিসহ বিভিন্ন দাবিতে দেশের বিভিন্ন স্থানে, বিশেষ করে কুমিল্লা ও চট্টগ্রামে, বিক্ষোভ ও আন্দোলনে নামেন এইচএসসি পরীক্ষার্থীরা।
সিটি করপোরেশন এলাকার বাসিন্দাদের অভিযোগ, ২০১১ সালের ১০ জুলাই কুমিল্লা সিটি করপোরেশন প্রতিষ্ঠার পর থেকে দায়িত্ব পালন করা মেয়ররা জলাবদ্ধতা নিরসনে কার্যকর কোন পদক্ষেপ নেননি। তাদের দাবি, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, অপর্যাপ্ত ড্রেনেজ ব্যবস্থা এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অভাবের কারণে প্রতি বর্ষায় একই দুর্ভোগের মুখোমুখি হতে হচ্ছে নগরবাসীকে। প্রতি বর্ষায় একই সমস্যার পুনরাবৃত্তি হলেও স্থায়ী সমাধানের জন্য সমন্বিত পরিকল্পনার বাস্তবায়ন দৃশ্যমান নয় বলেও অভিযোগ করেন তারা।
স্থানীয় ব্যবসায়ীদের দাবি, দীর্ঘ সময় পানি জমে থাকায় দোকানপাটে ক্রেতার সংখ্যা কমে যায় এবং অনেক ক্ষেত্রে পণ্য নষ্ট হওয়ারও আশঙ্কা থাকে। অন্যদিকে অভিভাবকদের অভিযোগ, স্কুল ও কলেজগামী শিক্ষার্থীদের নিরাপদে যাতায়াত নিশ্চিত করাও কঠিন হয়ে পড়ে। নগরবাসীর মতে, শুধু বর্ষাকালে অস্থায়ী ব্যবস্থা নিলেই হবে না; সমস্যার মূল কারণ চিহ্নিত করে দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।
নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, শুধু নতুন ড্রেন নির্মাণ করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। প্রাকৃতিক জলপ্রবাহের পথ সংরক্ষণ, খাল ও নালা দখলমুক্ত করা, নিয়মিত ড্রেন পরিষ্কার রাখা এবং নগর সম্প্রসারণের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে একটি আধুনিক ড্রেনেজ মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়ন জরুরি। অন্যথায় প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমে একই ধরনের পরিস্থিতি সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা থেকেই যাবে।
এদিকে নগরবাসী দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তাদের মতে, বর্ষা শেষ হওয়ার অপেক্ষা না করে এখনই ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলো চিহ্নিত করে স্থায়ী ড্রেনেজ উন্নয়ন, খাল পুনরুদ্ধার এবং জলাবদ্ধতা নিরসনে সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা উচিত। তাহলেই ভবিষ্যতে কুমিল্লা নগরবাসীকে প্রতি বর্ষায় একই দুর্ভোগের মুখোমুখি হতে হবে না।


আপনার মতামত লিখুন :