ঢাকা রবিবার, ২৬ জুলাই, ২০২৬, ১১ শ্রাবণ ১৪৩৩
Daily Global News
ইরানে মূল্যস্ফীতি প্রায় ৮৯ শতাংশ

ইরানি রিয়ালের রেকর্ড দরপতনে চরম অর্থনৈতিক সংকট

আন্তর্জাতি ডেস্ক

প্রকাশিত: জুলাই ২৬, ২০২৬, ০২:৩৮ পিএম

ইরানি রিয়ালের রেকর্ড দরপতনে চরম অর্থনৈতিক সংকট

ইরানে ভোক্তা পর্যায়ের মূল্যস্ফীতি এক বছরের ব্যবধানে প্রায় ৮৮.৬ শতাংশ বেড়েছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রে ২০২২ সালে যে ধরনের মূল্যস্ফীতির ধাক্কা পুরো বছরে দেখা গিয়েছিল, ইরানে এখন প্রায় প্রতি মাসেই তেমন চাপ অনুভূত হচ্ছে।

চলতি গ্রীষ্মে ইরানের মানুষের নজর একটি সংখ্যার দিকেই—মার্কিন ডলারের বিনিময় হার। তেহরানের উন্মুক্ত বাজারে বর্তমানে এক ডলারের দাম প্রায় ১৯ লাখ রিয়াল। সরকার মরিয়া হয়ে চেষ্টা করছে এই হার যেন ২০ লাখ রিয়াল অতিক্রম না করে।

এই সীমা ধরে রাখতে সরকার তাদের সীমিত বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ব্যয় করছে। তবে বাজার বিশ্লেষকদের ধারণা, অচিরেই ডলারের দাম ২০ লাখ রিয়ালের সীমা অতিক্রম করতে পারে।

রিয়াল থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন সাধারণ মানুষ

ইরানে বেতন রিয়ালে পরিশোধ করা হলেও অনেক মানুষ তাদের সঞ্চয় দ্রুত ডলার, স্বর্ণ, ক্রিপ্টোকারেন্সি, সম্পত্তি কিংবা দীর্ঘদিন সংরক্ষণযোগ্য খাদ্যপণ্যে রূপান্তর করছেন।

কারণ, ডলারের বিনিময় হারই এখন দেশটির প্রায় সব পণ্যের দামের নির্দেশক। বাড়িভাড়া, ওষুধ, গাড়ি এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য—সবকিছুর ওপরই এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে।

ডলারের দাম যখনই নতুন কোনো গোলাকার (Round Number) সীমা অতিক্রম করে, তখন ব্যবসায়ীরা পণ্যের নতুন দাম নির্ধারণ করেন, বাড়িওয়ালারা ভাড়া বাড়ান এবং বাজারে মূল্যবৃদ্ধির নতুন প্রত্যাশা তৈরি হয়। ফলে এসব সংখ্যা শুধু অর্থনৈতিক নয়, রাজনৈতিকভাবেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

দ্রুত অবমূল্যায়নের ইতিহাস

প্রায় ১৫ বছর আগে উন্মুক্ত বাজারে এক ডলারের দাম ছিল মাত্র ১০ হাজার রিয়াল

২০২৫ সালের এপ্রিল মাসে ডলারের দাম প্রথমবারের মতো ১০ লাখ রিয়াল অতিক্রম করে।

আর বর্তমানে সেই হার প্রায় ২০ লাখ রিয়াল স্পর্শ করছে।

অর্থাৎ, প্রথম ১৫ বছরে রিয়ালের মূল্য ডলারের বিপরীতে ধীরে ধীরে কমলেও, সর্বশেষ প্রায় দ্বিগুণ অবমূল্যায়ন ঘটেছে মাত্র ১৫ মাসে

অন্যভাবে বললে, রিয়ালের ডলারের বিপরীতে প্রথম ৯৯ শতাংশ মূল্য হারাতে সময় লেগেছিল ১৫ বছর, আর অবশিষ্ট মূল্যমানের প্রায় অর্ধেক হারাতে সময় লেগেছে মাত্র ১৫ মাস।

বর্তমান প্রবণতা অব্যাহত থাকলে আগামী ৫ থেকে ৮ মাসের মধ্যেই ডলারের দাম ৩০ লাখ রিয়াল ছুঁতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

কেন পরিস্থিতি সামাল দিতে পারছে না কেন্দ্রীয় ব্যাংক?

ইরানের সরকারি পরিসংখ্যান সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, জুন মাসে ভোক্তা মূল্যসূচক আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৮৮.৬ শতাংশ বেড়েছে। তবে সাধারণ মানুষের মতে, বিশেষ করে খাদ্যপণ্যের ক্ষেত্রে মূল্যবৃদ্ধি এর চেয়েও বেশি।

বিশ্লেষকদের মতে, চলমান যুদ্ধ, আন্তর্জাতিক অবরোধ, তেল রপ্তানির সীমাবদ্ধতা এবং সামুদ্রিক বাণিজ্যে বাধার কারণে সরকারের আয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। একই সঙ্গে অর্থনৈতিক মন্দার কারণে কর আদায়ও হ্রাস পেয়েছে।

এই ঘাটতি পূরণে সরকার ব্যাংকিং ব্যবস্থা এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মাধ্যমে নতুন অর্থ সরবরাহ বাড়াচ্ছে, যা মূল্যস্ফীতিকে আরও ত্বরান্বিত করছে।

সাম্প্রতিক মাসগুলোতে মাসিক মূল্যস্ফীতি ৭ থেকে ৯ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছেছে।

রিজার্ভ ব্যয় করেও স্থিতিশীলতা ফিরছে না

ইরানের কেন্দ্রীয় ব্যাংক অতীতেও ডলারের নির্দিষ্ট সীমা রক্ষার চেষ্টা করেছে।

২০২৪-২৫ সালের শীতে তারা ৯ লাখ রিয়াল সীমা ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছিল এবং ১০ লাখ রিয়াল অতিক্রমের ঘটনা ইরানি নববর্ষের পর পর্যন্ত বিলম্বিত করতে পেরেছিল।

তবে সেই সময় পর্যাপ্ত তেল আয় ছিল।

বর্তমানে যুদ্ধ ও অবরোধের মধ্যে সরকার যে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ব্যয় করছে, সেটিই মূলত ওষুধ ও খাদ্য আমদানির জন্য প্রয়োজনীয় রিজার্ভ।

অর্থনীতিবিদদের মতে, পর্যাপ্ত বৈদেশিক মুদ্রার আয় ছাড়া কেন্দ্রীয় ব্যাংক হয়তো কয়েক সপ্তাহের জন্য বাজারকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে নতুন কোনো ইতিবাচক প্রবণতা তৈরি করা সম্ভব নয়।

সামনে কী হতে পারে?

পরিস্থিতির ভবিষ্যৎ অনেকটাই নির্ভর করবে যুদ্ধের গতিপ্রকৃতি, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হস্তক্ষেপ এবং তেল রপ্তানি পুনরায় স্বাভাবিক হওয়ার ওপর।

বর্তমান মূল্যস্ফীতি ও মুদ্রার অবমূল্যায়নের ধারা অব্যাহত থাকলে আগস্ট মাসেই ডলারের দাম ২০ লাখ রিয়াল অতিক্রম করতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

অন্যদিকে যুদ্ধ আরও বিস্তৃত হলে প্রথমে বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে লেনদেন স্থবির হতে পারে, পরে বাজার খুললে ডলারের দাম আরও দ্রুত বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

তবে টেকসই যুদ্ধবিরতি হলে এই চাপ কিছুটা কমতে পারে।

সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন সেই সব ইরানি পরিবার, যাদের আয় সম্পূর্ণ রিয়ালে এবং যারা তাদের সঞ্চয় নিরাপদ কোনো সম্পদে রূপান্তর করার সুযোগ পাচ্ছেন না। তাদের কাছে প্রতিটি নতুন বিনিময় হার শুধু একটি সংখ্যা নয়, বরং ক্রমাগত কমে যাওয়া ক্রয়ক্ষমতার প্রতীক।
 

সূত্র : ইরান ইন্টারন্যাশনাল

banner
Link copied!