ইসলামী ব্যাংকের ৮০ হাজার কোটি টাকার ঋণ ও শেয়ার জালিয়াতিতে জড়িত ছিলেন সদ্য পদত্যাগকৃত রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন চুপ্পু ও তার কোম্পানি জেএমসি বিল্ডার্স—এমন অভিযোগের ভিত্তিতে হাইকোর্টে প্রতিবেদন দাখিল করেছে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ)।
বিএফআইইউ’র প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৭ সালে মো. সাহাবুদ্দিন চুপ্পু জেএমসি বিল্ডার্সের মনোনীত পরিচালক (নমিনেটেড ডিরেক্টর) হিসেবে ইসলামী ব্যাংকে যোগদান করেন এবং পরবর্তীতে ব্যাংকটির ভাইস চেয়ারম্যান পদে উন্নীত হন। ২০২৩ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের আগ পর্যন্ত তিনি এই পদে বহাল ছিলেন। প্রতিবেদনে অভিযোগ করা হয়েছে, তার ভাইস চেয়ারম্যান থাকাকালীন জেএমসি বিল্ডার্সসহ ২৪টি কোম্পানি ইসলামী ব্যাংক থেকে মোট ৮০ হাজার কোটি টাকা ঋণ গ্রহণ করে, যা এখনও পরিশোধ করা হয়নি।
বিএফআইইউ প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ইসলামী ব্যাংক থেকে জেএমসি বিল্ডার্সের ২৪টি কোম্পানির নামে মোট ৮১ দশমিক ৯২ শতাংশ শেয়ার হস্তান্তর করা হয়েছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৭ সাল থেকে ২০২৩ সালে রাষ্ট্রপতি হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত সাহাবুদ্দিন চুপ্পু এসব শেয়ার জালিয়াতিতে জড়িত ছিলেন। কেননা তিনি তখন জেএমসি বিল্ডার্সের প্রতিনিধি ডিরেক্টর হিসেবে ইসলামী ব্যাংকের দায়িত্ব পালন করে এসব শেয়ার অনুমোদন করেন।
সংশ্লিষ্ট রিট আবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে—এস আলমের কর্তৃক দখলকৃত শেয়ার উদ্যোক্তা শেয়ারহোল্ডার বা প্রকৃত মালিকদের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া এবং ঋণ জালিয়াতি ও শেয়ার জালিয়াতির অপরাধে অভিযুক্ত যে-ই হোক, তাকে বিচারের আওতায় আনার দাবি জানানো হয়েছে। আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একটি প্রতিষ্ঠান সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ শেয়ার নিতে পারে, কিন্তু এস আলম ও তাদের অঙ্গ প্রতিষ্ঠান ইসলামী ব্যাংক থেকে ৮১ দশমিক ৯২ শতাংশ শেয়ার জালিয়াতির মাধ্যমে হস্তান্তর করে সর্বমোট ২ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকা ঋণ তুলে নেয়, যা স্পষ্ট আইনলঙ্ঘন।
এর আগে, ইসলামী ব্যাংকের করা রিটের পর হাইকোর্টের বিচারপতি আশরাফুল কামাল ও বিচারপতি ওয়ালিউল ইসলাম ২০২৫ সালের ১১ মার্চ তিনটি নির্দেশনা ও রুল জারি করেন। নির্দেশনাগুলো হলো—ঋণ জালিয়াতিতে জড়িত বোর্ড ডিরেক্টররা আদালতের অনুমতি ছাড়া বিদেশ যেতে পারবেন না, তাদের ব্যাংক হিসাব জব্দ করা হবে এবং জেএমসি বিল্ডার্সের কোনো শেয়ার হস্তান্তর করা যাবে না। পাশাপাশি বিএফআইইউকে এ বিষয়ে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশনা দেওয়া হয়। বিএফআইইউ ২০২৫ সালের ২৯ অক্টোবর প্রতিবেদন দাখিল করলেও দীর্ঘদিন এ বিষয়ে শুনানি অনুষ্ঠিত হয়নি।
সর্বশেষ গত শনিবার (২৫ জুলাই) সংশ্লিষ্ট আদালত সূত্রে জানা গেছে, বিচারপতি মুজিবুর রহমান মিয়ার নেতৃত্বাধীন হাইকোর্ট বেঞ্চে আগামী বুধবার (২৯ জুলাই) এ বিষয়ে শুনানি অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। ইতিমধ্যে ঢাকা আদালত দুর্নীতি দমন কমিশনকে (দুদক) এ বিষয়ে তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন।
উল্লেখ্য, মো. সাহাবুদ্দিন চুপ্পু ২০২৩ সালের ২৪ এপ্রিল বাংলাদেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন এবং গত ২৪ জুলাই সংবিধানের ৫০(৩) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী পদত্যাগ করেন। পদত্যাগের পরই এই মামলায় তার নাম নতুন করে আলোচনায় আসে।
জাতীয় সংসদে বিরোধী দল ও বিভিন্ন সংগঠন সাবেক এই রাষ্ট্রপতির গ্রেপ্তারের দাবি জানিয়ে আসছে। আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, সংবিধানের ৫১ অনুচ্ছেদ রাষ্ট্রপতিকে পদে থাকাকালীন সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনের জন্য সুরক্ষা দিলেও এটি রাষ্ট্রপতি হওয়ার আগের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড বা পদত্যাগের পর আইনি প্রক্রিয়া থেকে রক্ষা করে না। সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের বিরুদ্ধে অতীতে একাধিক মামলা ও গ্রেপ্তারের নজির রয়েছে, যা আইনি প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতাকে আরও সুসংহত করেছে।


আপনার মতামত লিখুন :