ঢাকা রবিবার, ২৬ জুলাই, ২০২৬, ১১ শ্রাবণ ১৪৩৩
Daily Global News

মাইলস্টোন স্কুলে বিমান দুর্ঘটনা: গোপন তদন্ত প্রতিবেদনে বেরিয়ে এল গা শিউরে ওঠা তথ্য

ডিজিএন ডেস্ক

প্রকাশিত: জুলাই ২০, ২০২৬, ০৯:৪৯ পিএম

মাইলস্টোন স্কুলে বিমান দুর্ঘটনা: গোপন তদন্ত প্রতিবেদনে বেরিয়ে এল গা শিউরে ওঠা তথ্য

গত বছরের ২১শে জুলাই। একটি স্বাভাবিক দিনের মতো শুরু হলেও দুপুরের দিকে ঢাকার উত্তরা পরিণত হয়েছিল এক মৃত্যুপুরীতে। মাইলস্টোন স্কুল ও কলেজে বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর একটি যুদ্ধবিমান আছড়ে পড়ার ঘটনায় ২৮টি নিষ্পাপ শিশুসহ প্রাণ হারিয়েছিলেন ৩৬ জন। ভয়াবহ সেই ঘটনার পর গঠিত সরকারের উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিশনের পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন এত দিন অপ্রকাশিত থাকলেও, সম্প্রতি তা প্রকাশ্যে এসেছে। দীর্ঘ তিন মাসের তদন্ত শেষে জমা দেওয়া এই প্রতিবেদনে উঠে এসেছে পাইলটের প্রশিক্ষণের ঘাটতি, স্কুল কর্তৃপক্ষের চরম অবহেলা এবং ক্ষতিপূরণ নিয়ে স্বজনদের সাথে প্রহসনের এক করুণ চিত্র।

তদন্ত প্রতিবেদন বলছে, দুপুর ১২টা ৪৩ মিনিটে এফটি-৭ বিজিআই যুদ্ধবিমানটি নিয়ে আকাশে ওড়েন ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট তৌকির ইসলাম। এটি ছিল তার প্রথম একক উড্ডয়ন বা ‘সোলো ফ্লাইট’। মাত্র সাত মিনিট আকাশে থাকার পরই ঘটে যায় ভয়াবহ সেই দুর্ঘটনা। সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, বিমানটি বিধ্বস্ত হওয়ার ঠিক আগে এর উইন্ড-শিল্ডে একটি কালো দাগ ছিল।

ধারণা করা হচ্ছে, কোনো পাখি বা উড়ন্ত বস্তুর আঘাত থেকে বাঁচতে পাইলট তাৎক্ষণিকভাবে বিমানের গতিপথ পরিবর্তনের চেষ্টা করেছিলেন। বাঁক নেওয়ার সময় কন্ট্রোল স্টিক জোরে টানার ফলে মাত্র এক সেকেন্ডের ব্যবধানে বিমানটির অ্যাঙ্গেল বিপজ্জনক মাত্রায় পৌঁছে যায়। ফলে বিমানটি ‘স্টলড কন্ডিশনে’ চলে গিয়ে দ্রুত উচ্চতা হারাতে থাকে। শেষ মুহূর্তে কন্ট্রোল রুম থেকে অফিসার কমান্ডিং পাইলটকে অন্তত তিনবার প্যারাসুট দিয়ে বেরিয়ে আসার জন্য ‍‍`ইজেক্ট‍‍` কমান্ড দেন। কিন্তু ততক্ষণে বিমানটি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় এবং ১টা ১৪ মিনিটে বিকট শব্দে আছড়ে পড়ে স্কুলের ওপর।

যেকোনো বিমান দুর্ঘটনার পেছনে কারিগরি ত্রুটি খোঁজা হলেও, এই তদন্তে বিমানের কোনো ত্রুটি পাওয়া যায়নি। বরং প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে পাইলটের উড্ডয়ন প্রশিক্ষণের ঘাটতি এবং কর্মদক্ষতার অভাবকে দায়ী করা হয়েছে। বলা হয়েছে, গ্রাউন্ড সুপারভাইজার বা অফিসার কমান্ডিংয়েরও তদারকিতে বড় ধরনের গলদ ছিল। প্রথম সোলো ফ্লাইটের নিয়ম অনুযায়ী পাইলটকে যে নির্দেশনা দেওয়ার কথা ছিল, কন্ট্রোল রুম থেকে দেওয়া নির্দেশনার সাথে তার অসামঞ্জস্য পাওয়া গেছে। মূলত অনভিজ্ঞতার কারণেই পাইলট শেষ মুহূর্তে পরিস্থিতি সামাল দিতে ব্যর্থ হন।

এতগুলো প্রাণহানির পেছনে বিমানের বিস্ফোরণ যতটা না দায়ী, তার চেয়েও বড় কারণ ছিল স্কুল ভবনের ভয়াবহ কাঠামোগত ত্রুটি। রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, মাইলস্টোনের ওই ক্যাম্পাসের অর্ধেকের বেশি ভবনই ছিল অনুমোদনহীন। ক্ষতিগ্রস্ত হায়দার আলী ভবনে আয়তন অনুযায়ী অন্তত তিনটি জরুরি সিঁড়ি থাকার কথা থাকলেও সিঁড়ি ছিল মাত্র একটি। দুর্ভাগ্যজনকভাবে বিমানটি ঠিক সেই একমাত্র সিঁড়ির সামনেই বিধ্বস্ত হয়। বিমানে প্রায় ২১৫০ লিটার জেট ফুয়েল থাকায় মুহূর্তের মধ্যে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড ঘটে। বের হওয়ার কোনো বিকল্প পথ না থাকায় ভেতরে আটকে পড়া শিশু ও শিক্ষকদের বেশিরভাগই আগুনে পোড়ার চেয়েও আবদ্ধ ধোঁয়ায় শ্বাসরোধ হয়ে মর্মান্তিকভাবে মারা যান।

এত বড় ট্র্যাজেডির পর তদন্ত কমিশন হতাহতদের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট ক্ষতিপূরণ প্যাকেজের সুপারিশ করেছিল। সুপারিশ অনুযায়ী, নিহত শিশুদের পরিবারের জন্য এক কোটি টাকা, প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য ৮০ লাখ টাকা এবং আহতদের জন্য ক্ষতির মাত্রা অনুযায়ী ১০ থেকে ৬০ লাখ টাকা দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু এক বছর পেরিয়ে গেলেও ক্ষতিপূরণের সেই সুপারিশ আলোর মুখ দেখেনি। সরকারের পক্ষ থেকে নিহতদের জন্য মাত্র ২০ লাখ এবং আহতদের জন্য ৫ লাখ টাকা নেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হলে ক্ষুব্ধ পরিবারগুলো তা প্রত্যাখ্যান করে।

দুর্ঘটনায় নিহত শিক্ষার্থী তাসনিয়া হকের পিতা নাজমুল হক আক্ষেপ করে জানান, সন্তানের মৃত্যুর পর ক্ষতিপূরণ চাওয়াটাই লজ্জার। তারা সংবাদ সম্মেলন করেছেন, মন্ত্রীদের সাথে দেখা করেছেন, কিন্তু কেউ তাদের কথা শুনতে চাইছে না। একদিকে স্বজন হারানোর বেদনা, অন্যদিকে আহত শিশুদের দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসার বিপুল খরচ সব মিলিয়ে এক অনিশ্চিত অন্ধকারের মধ্যে দিন পার করছে ভুক্তভোগী পরিবারগুলো। তদন্ত প্রতিবেদন জমা হলেও, এর সুপারিশ বাস্তবায়ন এবং দোষীদের জবাবদিহিতার আওতায় আনার বিষয়টি তাই এখনো অধরাই রয়ে গেছে। সূত্র: বিবিসি

ডিজিএন/এনএস

banner
Link copied!