দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে সাম্প্রতিক সময়ে এক বিশাল পরিবর্তন লক্ষ করা যাচ্ছে। বিশেষ করে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পটপরিবর্তন এবং এর জেরে আঞ্চলিক পরাশক্তি ভারতের নীতিগত অবস্থানে পরিবর্তন এখন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের প্রধান আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। আর এই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য দিল্লি সফর।
দীর্ঘ ১৭ বছর পর বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে দিল্লির এই কূটনৈতিক যোগাযোগ দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে এক নতুন সমীকরণের জন্ম দিয়েছে। একই সঙ্গে এই সফর আঞ্চলিক রাজনীতিতে ভারতের একচ্ছত্র প্রভাব ও গুরুত্ব হ্রাস পাওয়ার বিষয়টিকেও বড় একটি প্রশ্নবোধক চিহ্নের সামনে দাঁড় করিয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, তারেক রহমানের এই সফর শুধু সাধারণ কোনো রাজনৈতিক সফর নয়, বরং এটি ভারতের ‘নেইবারহুড ফার্স্ট’ পলিসির একটি বড় কৌশলগত পরিবর্তন বা ইউ-টার্ন। দীর্ঘ ১৭ বছর ধরে কেবল আওয়ামী লীগ সরকারের সঙ্গে সুদৃঢ় সম্পর্ক বজায় রাখায় বিএনপি ও অন্যান্য বিরোধী দলের সঙ্গে দিল্লির দূরত্ব তৈরি হয়েছিল। কিন্তু গত আগস্টের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান এবং পরবর্তী রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট দিল্লিকে তার দীর্ঘদিনের একপাক্ষিক নীতি পুনর্মূল্যায়নে বাধ্য করেছে।
ভারত এখন বুঝতে পারছে, বাংলাদেশের জনগণকে উপেক্ষা করে কেবল একটি নির্দিষ্ট দলের ওপর বাজি ধরা দীর্ঘমেয়াদে তাদের জাতীয় নিরাপত্তার জন্যই হুমকিস্বরূপ। তাই ভারতের সংসদীয় কমিটি ও কূটনৈতিক বিশ্লেষকেরা বাংলাদেশের এই নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতাকে ১৯৭১ সালের পর তাদের জন্য সবচেয়ে বড় কৌশলগত চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন।
তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর নিয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন ভারতের শীর্ষ কূটনীতিক বিদ্যা ভূষণ সোনি। ভারতীয় বার্তা সংস্থা এএনআই-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, এই সফরের মাধ্যমে তিস্তা নদীর পানি বণ্টন ও রোহিঙ্গা শরণার্থী সমস্যার মতো অমীমাংসিত বিষয়গুলো সমাধানের নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে। তিনি সতর্ক করে বলেন, এই যোগাযোগের সুযোগ কোনোভাবেই হাতছাড়া করা উচিত নয়।
অন্যদিকে, এই সফরের জন্য একটি অনুকূল পরিবেশ তৈরি করতে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দুটি শর্ত জুড়ে দিয়েছে। এর মধ্যে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করা এবং ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদির হত্যার আসামিদের বাংলাদেশের হাতে তুলে দেওয়ার দাবি জানিয়েছে ঢাকা।
তারেক রহমানের এই সফরের সমান্তরালে দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের সামগ্রিক প্রভাব কমার লক্ষণগুলো নিয়েও জোরালো আলোচনা চলছে। এর অন্যতম প্রধান কারণ হলো প্রতিবেশী দেশগুলোতে কেবল একটি নির্দিষ্ট শাসকগোষ্ঠীর ওপর অতি-নির্ভরশীলতা এবং ‘দাদাগিরি’ বা বিগ ব্রাদারসুলভ মনোভাব। বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা বা মালদ্বীপের মতো দেশগুলোতে যখনই ক্ষমতার পালাবদল হয়েছে, ভারতের প্রভাব বড় ধরনের ধাক্কা খেয়েছে।
নেপাল, ভুটান ও মালদ্বীপে ভারতের অভ্যন্তরীণ হস্তক্ষেপের অভিযোগ আঞ্চলিক রাজনীতিতে তাদের গ্রহণযোগ্যতা কমিয়েছে। অন্যদিকে চীনের ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক ও কৌশলগত প্রবেশ ভারতের ঐতিহ্যগত ‘প্রভাব বলয়’ ভেঙে দিয়েছে। অর্থনৈতিক সংকটে পড়া দেশগুলো এখন দিল্লির ঋণের চেয়ে বেইজিংয়ের আর্থিক সহায়তার দিকেই বেশি ঝুঁকছে।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে তারেক রহমানের দিল্লি সফরকে ভারতের জন্য একটি ‘ড্যামেজ কন্ট্রোল’ বা ক্ষতিপূরণের চেষ্টা হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা। উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর নিরাপত্তা এবং ট্রানজিট সুবিধা ধরে রাখতে বাংলাদেশে স্থিতিশীলতা থাকা ভারতের জন্য অত্যন্ত জরুরি। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও অত্যন্ত চতুরতার সঙ্গে চীনের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখে ভারসাম্যের রাজনীতি করছেন, যা ভারতের একতরফা চাপ সৃষ্টির সুযোগকে সীমিত করে বিএনপিকে সুবিধাজনক অবস্থানে নিয়ে গেছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই সফর দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক রাজনীতিতে এক নতুন যুগের সূচনা করেছে। ভারত যদি তার পুরোনো ‘বিগ ব্রাদার’ মনোভাব থেকে বেরিয়ে এসে পারস্পরিক সমতা ও জনগণের আকাঙ্ক্ষার প্রতি শ্রদ্ধা না জানায়, তবে আগামী দিনগুলোতে এই অঞ্চলে দিল্লির প্রভাব আরও সংকুচিত হতে বাধ্য।
সূত্র: এএনআই, টাইমস অব ইন্ডিয়া, এনডিটিভি, বিবিসি


আপনার মতামত লিখুন :