ঢাকা সোমবার, ২৪ আগস্ট, ২০২৬, ৯ ভাদ্র ১৪৩৩
Daily Global News

দিল্লিকে ঢাকার কড়া শর্ত: নেপথ্যে অবিশ্বাস নাকি সম্পর্কের ‘রিসেট’ চায় বাংলাদেশ?

ডিজিএন ডেস্ক

প্রকাশিত: আগস্ট ২২, ২০২৬, ০৫:২৯ পিএম

দিল্লিকে ঢাকার কড়া শর্ত: নেপথ্যে অবিশ্বাস নাকি সম্পর্কের ‘রিসেট’ চায় বাংলাদেশ?

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আসন্ন ভারত সফর আপাতত স্থগিত হয়ে গেছে। ভারতের প্রস্তাব ও আগ্রহ সত্ত্বেও ঢাকা বেশ কয়েকটি কড়া শর্ত জুড়ে দেওয়ায় দ্বিপক্ষীয় এই সফরটি স্থগিত হয়। কূটনৈতিক মহলে এখন প্রশ্ন উঠেছে, হঠাৎ এমন কড়া শর্তের পেছনে কি ভারতের প্রতি ঢাকার অবিশ্বাস কাজ করছে, নাকি সম্পর্কের নতুন সমীকরণ বা ‘রিসেট’ চাইছে বাংলাদেশ?

ভারত আগামী সেপ্টেম্বরে অনুষ্ঠিতব্য ব্রিকস সম্মেলনে বাংলাদেশকে প্রথম আমন্ত্রণ জানিয়েছিল। তবে ঢাকা বহুপক্ষীয় ওই সম্মেলনের বদলে দ্বিপক্ষীয় সফরে বেশি আগ্রহী ছিল। এরপর ভারত দ্রুত পদক্ষেপ নিয়ে আগস্টেই একটি দ্বিপক্ষীয় সফরের উদ্যোগ নেয়। কিন্তু সম্প্রতি দিল্লিতে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এক সংবাদ সম্মেলনকে ঘিরে দৃশ্যপট পাল্টে যায়।

ঢাকা এ নিয়ে কড়া প্রতিক্রিয়া দেখায়, যাকে বিশ্লেষকদের অনেকেই ‘নজিরবিহীন’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। এর কয়েক দিন পর, গত ১০ আগস্ট ঢাকায় নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার দিনেশ ত্রিবেদী প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। ওই দিনই তিনি দিল্লি ফিরে গিয়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির কাছে ঢাকার মনোভাব তুলে ধরেন।

সফরের বিষয়ে আলোচনা যখন আবার গতি পাচ্ছিল, ঠিক তখনই গত রোববার ঢাকার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক সংবাদ সম্মেলনে ভারত সফরের আগে ‘সহায়ক পরিবেশ’ তৈরির কথা বলে। ভারতের কাছে পাঠানো শর্ত দুটির কথা উল্লেখ করে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র এ কে এম শহীদুল করিম জানান, দ্বিপক্ষীয় প্রত্যর্পণ চুক্তি অনুযায়ী শেখ হাসিনাসহ অন্যান্য পলাতক অপরাধীকে দ্রুত ফেরত পাঠানো এবং শরীফ ওসমান হাদী হত্যাকাণ্ডে অভিযুক্তদের বাংলাদেশের হাতে তুলে দিতে হবে। ঢাকা এখন ভারতের জবাবের অপেক্ষায় রয়েছে।

সফরের ঠিক আগমুহূর্তে বাংলাদেশের এমন শর্তে বেশ বিস্ময় প্রকাশ করেছে দিল্লি। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরাও ঢাকার এমন অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।

ভারতের ওপি জিন্দাল গ্লোবাল ইউনিভার্সিটির আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অধ্যাপক শ্রীরাধা দত্ত বলেন, “শর্তগুলো বেশ কঠিন এবং এগুলো সম্পর্ককে জটিল করতে পারে। ভারতের কাছে এসব শর্ত অজানা নয়, কিন্তু এগুলো পূরণ না হলে বৈঠক হবে না এমন অবস্থান অবাক করার মতো। আলোচনা যত দ্রুত হতো, ততই ভালো হতো।”

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ড. ইমতিয়াজ আহমেদও মনে করেন, শর্ত দিয়ে আলোচনা বন্ধ রাখা যৌক্তিক নয়। তিনি বলেন, “আমাদের পানি, সীমান্ত হত্যা বা জ্বালানির মতো আরও অনেক গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু রয়েছে। আলোচনা না করে এসবের সমাধান কীভাবে হবে?”

অন্যদিকে সাবেক কূটনীতিক এম হুমায়ুন কবীর মনে করেন, যে সময়ের মধ্যে সফরের কথা চলছিল, তার মধ্যে প্রত্যাশা পূরণ সম্ভব কি না, তা বাংলাদেশের বিবেচনা করার সুযোগ ছিল।

বিশ্লেষকদের মতে, ঢাকার এমন কঠোর অবস্থানের পেছনে মূলত তিনটি বিষয় কাজ করছে ভারতে শেখ হাসিনার অবস্থান ও তৎপরতা, রাজনীতিতে আওয়ামী লীগের ফেরার চেষ্টা এবং শেখ হাসিনাকে নিয়ে ভারতের ভূমিকার ওপর ‘অবিশ্বাস’।

গত ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর শেখ হাসিনা ভারতে আশ্রয় নেন। বর্তমানে সেখানে বসে তাঁর রাজনৈতিক তৎপরতা বা সংবাদ সম্মেলনকে বাংলাদেশ সরকার নিজেদের জন্য হুমকি হিসেবে দেখছে। এর পেছনে ভারতের সমর্থন আছে কি না, তা নিয়েও ঢাকার উদ্বেগ রয়েছে। সম্প্রতি বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদও ‘হাসিনা কার্ড’ খেলার বিষয়ে দিল্লিকে সতর্ক করে দিয়েছেন।

কূটনীতিক এম হুমায়ুন কবীর মনে করেন, বাংলাদেশ মূলত ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের একটি পুনর্বিন্যাস বা ‘রিসেট’ চাইছে। ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতির আলোকে ঢাকা এখন কোনো বিশেষ রাষ্ট্রের দিকে না ঝুঁকে অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ ছাড়া জাতীয় মর্যাদা ও সার্বভৌম সমতার ভিত্তিতে সম্পর্ক এগিয়ে নিতে চায়।

বিশ্লেষকদের অভিমত, সম্পর্ক নতুন করে শুরু করতে হলেও শীর্ষ নেতাদের মধ্যে সরাসরি সংলাপ প্রয়োজন। সামনাসামনি আলোচনা ছাড়া জটিলতা কাটানো কঠিন। একবার সফর অনিশ্চিত হয়ে যাওয়ার পর এখন ঢাকার দেওয়া শর্ত এবং সম্পর্ক পুনর্বিন্যাসের আকাঙ্ক্ষার কীভাবে সুরাহা হয়, তার ওপরই নির্ভর করছে দুই দেশের সম্পর্কের ভবিষ্যৎ গতিপ্রকৃতি। সূত্র: বিবিসি

ডিজিএন/এফএ

banner
Link copied!