সাবেক রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের পর আজ বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিত হচ্ছে দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচন। প্রায় সাড়ে তিন দশক পর একাধিক প্রার্থীর মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হতে যাচ্ছেন। জাতীয় সংসদের সদস্যরা এই নির্বাচনে ভোট দিয়ে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করবেন।
দীর্ঘদিন ধরে জাতীয় সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের মনোনীত প্রার্থীই রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়ে আসছিলেন। তবে এবার বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট আলাদা প্রার্থী দেওয়ায় সেই ধারায় পরিবর্তন এসেছে। নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন বিএনপির প্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এবং জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্যের প্রার্থী ড. অলি আহমদ বীর বিক্রম।
১৯৯১ সালের পর সংসদীয় পদ্ধতিতে এটিই প্রথম একাধিক প্রার্থীর মধ্যে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন। সর্বশেষ ওই বছর বিএনপি ও আওয়ামী লীগ-সমর্থিত প্রার্থীর মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আবদুর রহমান বিশ্বাস রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন। ওই নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী আবদুর রহমান বিশ্বাস ১৭২ ভোট এবং আওয়ামী লীগ-সমর্থিত প্রার্থী বদরুদ্দোজা চৌধুরী ৯২ ভোট পেয়েছিলেন।
নির্বাচন কমিশন সূত্রে জানা গেছে, ১৯৯১ সালে গণঅভ্যুত্থানের পর সংবিধানের দ্বাদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংসদীয় সরকারব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তন করা হয়। এরপর রাষ্ট্রপতি নির্বাচন পরিচালনার জন্য প্রণয়ন করা হয় ‘রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আইন, ১৯৯১’। ওই আইনের অধীন অনুষ্ঠিত প্রথম রাষ্ট্রপতি নির্বাচনেও সংসদ সদস্যরা ওপেন ব্যালটে ভোট দিয়েছিলেন।
এবারের নির্বাচনেও ব্যালটের মাধ্যমে ভোট দেবেন সংসদ সদস্যরা। সংবিধানের ৪৮(১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, জাতীয় সংসদের সদস্যরাই রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ভোটার। বর্তমানে ভোটার সংখ্যা ৩৪৯ জন।
ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী, গত ১৩ আগস্ট মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার দিনে তিনটি মনোনয়নপত্র দাখিল করা হয়। এর মধ্যে ড. অলি আহমদ বীর বিক্রমের পক্ষে দুটি এবং মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের পক্ষে একটি মনোনয়নপত্র জমা পড়ে।
১৬ আগস্ট মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই শেষে তিনটি মনোনয়নপত্রই বৈধ ঘোষণা করা হয়। তবে একই প্রার্থীর দুটি বৈধ মনোনয়নপত্রের মধ্যে একটি অতিরিক্ত হিসেবে গণ্য হওয়ায় চূড়ান্তভাবে দুই প্রার্থীর মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হচ্ছে। মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের শেষ দিন ১৮ আগস্ট কোনো প্রার্থীই প্রার্থিতা প্রত্যাহার করেননি।
জাতীয় সংসদের নিয়মিত অধিবেশন না থাকায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আইন অনুযায়ী প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও নির্বাচনী কর্তা এ এম এম নাসির উদ্দিন সংসদ সদস্যদের বৈঠক আহ্বান করেছেন। গত ১১ আগস্ট এ-সংক্রান্ত গেজেট প্রকাশ করা হয়।
আজ দুপুর ২টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত জাতীয় সংসদ ভবনে ভোট গ্রহণ করা হবে। প্রধানমন্ত্রী, স্পিকার, বিরোধীদলীয় নেতা এবং অন্যান্য সংসদ সদস্যরা ভোট দেবেন। ভোট গ্রহণ শেষ হওয়ার পরপরই গণনা শুরু হবে। ফলাফল আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করবেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার।
নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, পুরো ভোট ও গণনা প্রক্রিয়া স্বচ্ছভাবে সম্পন্ন করা হবে। ভোট গ্রহণ ও গণনার সময় সংসদ সদস্যরা উপস্থিত থাকতে পারবেন। ব্যালটপত্রে প্রার্থী ও ভোটারের নাম স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকায় ভোটদান প্রক্রিয়াটি উন্মুক্ত থাকবে। ভিআইপি ভোটারদের ভোটদান এবং ভোট গণনার পর্ব বাংলাদেশ টেলিভিশনে সরাসরি সম্প্রচারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
নির্বাচনের আগের দিন প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিন বলেন, সাবেক রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন গত ২৪ জুলাই পদত্যাগ করার পর ওই দিনই মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে এ-সংক্রান্ত গেজেট প্রকাশ করা হয়। এরপর সংবিধান ও প্রচলিত আইন অনুযায়ী নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রক্রিয়া শুরু করে নির্বাচন কমিশন।
সিইসি বলেন, ১৯৯১ সালের পর দীর্ঘ সময় রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক ভোট না হওয়ায় এ ধরনের নির্বাচনের বাস্তব অভিজ্ঞতায় কিছুটা ঘাটতি ছিল। তবে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি, মহড়া ও প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করেছে কমিশন।
ভোটার তালিকা নিয়ে কিছুটা ভিন্নতার বিষয়ে সিইসি বলেন, জাতীয় সংসদের আসনভিত্তিক ক্রম অনুযায়ী পঞ্চগড়-১ থেকে শুরু করে বান্দরবান পর্যন্ত ৩০০ আসন থাকলেও রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে সংসদের বিভক্তি নম্বর অনুযায়ী ভোট গ্রহণের ব্যবস্থা করা হয়েছে। চট্টগ্রাম-৪ আসনের উপনির্বাচন বা আসনটি শূন্য থাকায় ভোটার তালিকার বিভক্তি নম্বরে কিছুটা বিচ্ছিন্নতা রয়েছে। তবে বিষয়টি নিয়ম অনুযায়ী সমাধান করা হয়েছে।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচন পরিচালনার ক্ষেত্রে স্পিকারের সঙ্গে পরামর্শ করা আইনগত বাধ্যবাধকতা রয়েছে উল্লেখ করে সিইসি বলেন, সে অনুযায়ী স্পিকারের সঙ্গে পরামর্শ করেই নির্বাচনের সময়সূচি ও অন্যান্য কার্যক্রম নির্ধারণ করা হয়েছে।
সংসদ ভবনের ভেতরে নির্বাচনী প্রচারণার কোনো সুযোগ থাকবে না বলেও জানান তিনি। এ ছাড়া নির্বাচনকে কেন্দ্র করে অতিরিক্ত বা বিপুল অর্থ ব্যয়ের যে আলোচনা রয়েছে, তা গুজব বলে উল্লেখ করেন সিইসি। তাঁর ভাষ্য, সংসদ সদস্যদের বৈঠক আহ্বান, ব্যালট ও কিছু স্টেশনারি ছাড়া কমিশনের বড় ধরনের অতিরিক্ত ব্যয় নেই।
গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী পরিস্থিতিতে দেশের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মহলেরও এই নির্বাচনের দিকে নজর রয়েছে বলে মন্তব্য করেন সিইসি। তিনি আশা প্রকাশ করেন, সবার সহযোগিতায় নির্বাচন কমিশন একটি সুন্দর, স্বচ্ছ ও ঐতিহাসিক রাষ্ট্রপতি নির্বাচন সম্পন্ন করতে পারবে।


আপনার মতামত লিখুন :