প্রায় ৩৫ বছর পর সরাসরি ভোটের মাধ্যমে বাংলাদেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। জাতীয় সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে তিনি পেয়েছেন ২৫৫ ভোট। তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) চেয়ারম্যান এবং জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্যের প্রার্থী অলি আহমদ।
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বর্তমানে সরকারের স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে ছিলেন। আনুষ্ঠানিক শপথ গ্রহণের পর আগামী পাঁচ বছরের জন্য তিনি বঙ্গভবনের দায়িত্ব নেবেন।
এর আগে আওয়ামী লীগের মনোনয়নে নির্বাচিত ২২তম রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন তাঁর মেয়াদের প্রায় দেড় বছর বাকি থাকতেই গত ২৪ জুলাই পদত্যাগ করেন। এরপর নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রক্রিয়া শুরু করে নির্বাচন কমিশন।
চলতি মাসের শুরুতে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হয়। এরপর বিএনপির পক্ষ থেকে দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে রাষ্ট্রপতি পদে মনোনয়ন দেওয়া হয়। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্য প্রার্থী করে এলডিপি চেয়ারম্যান অলি আহমদকে।
১৯৯১ সালের পর এই প্রথম একাধিক প্রার্থীর মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতার মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হলেন। দীর্ঘ সময় ধরে জাতীয় সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের মনোনীত প্রার্থীরাই কার্যত বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়ে আসছিলেন।
১৯৯১ সালে বিএনপির প্রার্থী আবদুর রহমান বিশ্বাস ও আওয়ামী লীগ-সমর্থিত প্রার্থী বদরুদ্দোজা চৌধুরীর মধ্যে সরাসরি ভোট হয়েছিল। ওই নির্বাচনে আবদুর রহমান বিশ্বাস ১৭২ ভোট পেয়ে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন।
এবারের নির্বাচনে সংসদ সদস্যরা সরাসরি ভোট দেন। ভোট গ্রহণ শেষে মির্জা ফখরুল ২৫৫ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন।
রাষ্ট্রপতি পদে নির্বাচিত হওয়ার আগে দীর্ঘ রাজনৈতিক পথ পাড়ি দিয়েছেন মির্জা ফখরুল। বিশেষ করে বিএনপির কঠিন সময়ে দলের নেতৃত্ব দেওয়ার কারণে তিনি দলটির গুরুত্বপূর্ণ নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হন।
খালেদা জিয়া কারাবন্দী এবং তারেক রহমান দেশের বাইরে অবস্থান করার সময় বিএনপির সাংগঠনিক ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে দেশের ভেতর থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন তিনি। বিভিন্ন সময় মামলা, গ্রেপ্তার ও রাজনৈতিক চাপের মুখেও দলের কার্যক্রমে সক্রিয় ছিলেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দায়িত্বশীল ভূমিকা ও তুলনামূলকভাবে সংযত রাজনৈতিক বক্তব্যের কারণে বিএনপির বাইরেও মির্জা ফখরুলের একটি গ্রহণযোগ্য ভাবমূর্তি তৈরি হয়েছে।
লেখক ও গবেষক মহিউদ্দিন আহমদের মতে, বিএনপি যখন কঠিন রাজনৈতিক সময় পার করছিল, তখন মির্জা ফখরুল দৃঢ় অবস্থান নিয়ে দলকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। বারবার গ্রেপ্তার ও রাজনৈতিক চাপের মুখেও তিনি দলের সঙ্গে ছিলেন।
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের রাজনৈতিক জীবনের শুরু ছাত্রজীবনে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় ষাটের দশকে তিনি পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নে যুক্ত হন। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এসএম হল ইউনিটের সাধারণ সম্পাদক এবং ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের সময় সংগঠনটির ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ইউনিটের সভাপতি হন।
শিক্ষাজীবন শেষে ১৯৭২ সালে বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারে যোগ দেন। ঢাকা কলেজসহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অর্থনীতির শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি।
১৯৭৯ সালে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের প্রশাসনে উপপ্রধানমন্ত্রী এস এ বারীর একান্ত সচিব হিসেবে যোগ দেন। এরপর ১৯৮৬ সালে মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টিতে (ন্যাপ) যোগ দেওয়ার মধ্য দিয়ে জাতীয় রাজনীতিতে সক্রিয় হন।
১৯৮৮ সালে তিনি ঠাকুরগাঁও পৌরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। এর দুই বছর পর এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময় বিএনপিতে যোগ দেন। ১৯৯২ সালে ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপির সভাপতি হন।
২০০১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোটের প্রার্থী হিসেবে ঠাকুরগাঁও-১ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ওই বছরই তিনি প্রথমে কৃষি প্রতিমন্ত্রী এবং পরে বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পান। ২০০৬ সালের অক্টোবর পর্যন্ত তিনি ওই দায়িত্বে ছিলেন।
২০০৯ সালে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব হন মির্জা ফখরুল। ২০১১ সালে দলের মহাসচিব খন্দকার দেলোয়ার হোসেনের মৃত্যুর পর তাঁকে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব দেওয়া হয়। ২০১৬ সালে তিনি বিএনপির পূর্ণাঙ্গ মহাসচিব হন।
এরপর দীর্ঘ সময় ধরে বিএনপির রাজনৈতিক সংকটের মধ্যে দলের নেতৃত্ব দেন তিনি। ২০১৪ সালের নির্বাচন বর্জন, আন্দোলন, গ্রেপ্তার ও মামলা বিভিন্ন রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে দলটির গুরুত্বপূর্ণ মুখ হিসেবে সামনে ছিলেন মির্জা ফখরুল।
২০১৮ সালে খালেদা জিয়া কারাবন্দী হওয়ার পর এবং তারেক রহমান দেশের বাইরে অবস্থান করায় দলের দেশের ভেতরের নেতৃত্বে তাঁর ভূমিকা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের কেউ কেউ মনে করেন, দীর্ঘ সময় ধরে দলকে নেতৃত্ব দেওয়া এবং তাঁর ব্যক্তিগত রাজনৈতিক ভাবমূর্তিই তাঁকে রাষ্ট্রপতি পদের জন্য উপযুক্ত প্রার্থী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের জন্ম ১৯৪৮ সালের ২৬ জানুয়ারি ঠাকুরগাঁও শহরের কালিবাড়ি এলাকায়। তাঁর বাবা মির্জা রুহুল আমিন ছিলেন আইনজীবী এবং পাকিস্তান প্রাদেশিক আইনসভার সদস্য। পরে তিনি বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের সদস্য এবং এরশাদ সরকারের মন্ত্রিসভার সদস্যও ছিলেন।
ঠাকুরগাঁওয়ে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা শেষে মির্জা ফখরুল ঢাকা কলেজে পড়াশোনা করেন। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন।
তাঁর স্ত্রী রাহাত আরা বেগম। তাঁদের দুই মেয়ে মির্জা শামারুহ ও মির্জা সাফারুহ। ছোট ভাই মির্জা ফয়সাল আমিনও বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত এবং বর্তমানে ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপির সভাপতি।
ছাত্রজীবনে রাজনীতির পাশাপাশি নাট্যচর্চা, অভিনয় ও আবৃত্তির সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন মির্জা ফখরুল।
প্রায় সাড়ে তিন দশক পর প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের মধ্য দিয়ে এবার রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে বসতে যাচ্ছেন দীর্ঘ রাজনৈতিক পথ পাড়ি দেওয়া মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।


আপনার মতামত লিখুন :