ঢাকা রবিবার, ৩০ আগস্ট, ২০২৬, ১৫ ভাদ্র ১৪৩৩
Daily Global News
বিবিসির বিশ্লেষণ

তারেক রহমানের দিল্লি সফর নিয়ে জল্পনা: ভারতের আগ্রহের নেপথ্যে কী?

ডিজিএন ডেস্ক

প্রকাশিত: আগস্ট ২৮, ২০২৬, ০৭:২২ পিএম

তারেক রহমানের দিল্লি সফর নিয়ে জল্পনা: ভারতের আগ্রহের নেপথ্যে কী?

প্রতিবেশী দুটি দেশের সরকারের মধ্যে চালাচালি হওয়া ই-মেইল থেকে তাদের সম্পর্কের বিষয়ে আভাস পাওয়া যাচ্ছে এমনটা খুব বেশি দেখা যায় না। কিন্তু চলতি মাসের শুরুতে ভারতের রাষ্ট্রপতির দপ্তর থেকে পাঠানো এক বার্তা ঠিক সেটাই করেছিল, যা দ্রুতই নজর কাড়ে কূটনীতিক ও সাংবাদিকদের।

বার্তায় বলা হয়েছিল, সপ্তাহের শেষ দিকে রাষ্ট্রপতি ভবনে আয়োজিত হওয়ার কথা থাকলেও ‍‍`চেঞ্জ অব গার্ড‍‍` আনুষ্ঠানিকতা বাতিল করা হয়েছে। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাগত জানানোর প্রস্তুতি হিসেবে সেখানে এই মহড়া চলছিল।

সমস্যা ছিল একটাই, এই সফরের বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছুই জানানো হয়নি। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ই-মেইলটি প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়। তবে এর ফলে তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর নিয়ে কয়েক সপ্তাহ ধরে চলা জল্পনা আরও জোরালো হয়। একই সঙ্গে বাংলাদেশের নতুন নেতাকে দিল্লিতে নিয়ে আসতে ভারতের প্রচেষ্টার বিষয়টিও সামনে আসে।

তবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এই সফরে এখনো সম্মতি দেননি। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব এএএম সালেহ বিবিসিকে বলেন, “সফরের বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।”

ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচনে বিপুল বিজয় পাওয়ার পর প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়া তারেক রহমানের এটাই হবে প্রথম ভারত সফর। এর আগে দীর্ঘদিনের নেতা শেখ হাসিনা ২০২৪ সালের আগস্টে গণ-অভ্যুত্থানের মুখে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে ভারতে পালিয়ে যান। এরপর মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে দুই দেশের সম্পর্কের দ্রুত অবনতি ঘটে।

দিল্লি এখন আশা করছে, তারেক রহমানের সরকারের মাধ্যমে দুই দেশের গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক নতুন করে সাজানোর সুযোগ তৈরি হবে। তবে ভারতের মাটিতে শেখ হাসিনার অবস্থান বিষয়টিকে জটিল করে তুলছে।

হাসিনাকে প্রত্যর্পণের জন্য ভারতকে অনুরোধ করেছে বাংলাদেশ। এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব বলেন, “আমরা অনুকূল পরিবেশ তৈরির আহ্বান জানিয়েছি এবং শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণপ্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করার বিষয়ে ভারতের প্রতিক্রিয়ার অপেক্ষায় আছি।” ভারত জানিয়েছে, বাংলাদেশের এই অনুরোধটি বিবেচনা করা হচ্ছে।

এত কিছুর পরও নতুন সরকারের সঙ্গে বারবার যোগাযোগের উদ্যোগ নিয়েছে দিল্লি। তারেক রহমান দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই তাঁকে আনুষ্ঠানিকভাবে আমন্ত্রণ জানানো হয়। বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী প্রধানমন্ত্রীসহ শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করেছেন। তিনি জানিয়েছেন, তারেক রহমান ভারত সফরে গেলে তাঁকে ‘সর্বোচ্চ সম্মান’ ও ‘স্মরণীয় অভ্যর্থনা’ দেওয়া হবে।

ভারতের জন্য প্রকাশ্যে এমন উৎসাহ দেখানো অস্বাভাবিক। সাবেক ভারতীয় পররাষ্ট্রসচিব শ্যাম শরণ বলেন, “আমার মনে হয়, দিল্লিতে কিছুটা হতাশা তৈরি হয়েছে। কারণ, হাসিনাকে হস্তান্তর ছাড়া ঢাকার সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানোর ক্ষেত্রে তারা বেশ অনেকটাই এগিয়েছে।”

তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, বাংলাদেশের তাৎক্ষণিক কিছু প্রয়োজন মেটাতেও ভারত প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ এবং চিকিৎসার জন্য ভিসা দেওয়া। এ ছাড়া বাণিজ্য সহজ করতে দুই দেশের মধ্যে থাকা কয়েকটি দ্বিপক্ষীয় ব্যবস্থাও পুনরুজ্জীবিত করা হয়েছে।

ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোতে যোগাযোগ ও প্রবেশাধিকার বাড়ানোর ক্ষেত্রে বাংলাদেশ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। হাসিনার ১৫ বছরের শাসনামলে দুই দেশ সড়ক, রেল ও বন্দর যোগাযোগ সম্প্রসারণ করেছিল। তবে তাঁর সঙ্গে ভারতের একপেশে ঘনিষ্ঠতা বাংলাদেশে সমালোচিত হয়েছিল।

বর্তমানে ভারতে হাসিনার অবস্থান এই উত্তেজনাকে বাঁচিয়ে রেখেছে। গত ৫ আগস্ট দিল্লিতে সাউথ এশিয়া ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাব আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে শেখ হাসিনা ভার্চ্যুয়ালি যুক্ত হয়ে ডিসেম্বরে দেশে ফেরার অঙ্গীকার করেন এবং তারেক রহমানের সরকারের বিরুদ্ধে দমন-পীড়নের অভিযোগ আনেন।

এ ঘটনায় বাংলাদেশ তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছে। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ওই অনুষ্ঠানে তাদের কোনো ভূমিকা ছিল না এবং সেখানে যথাযথভাবে গঠিত বাংলাদেশ সরকার সম্পর্কে যা বলা হয়েছে, তার কোনোটিই ভারত সমর্থন করে না।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক লাইলুফার ইয়াসমিন বলেন, “হাসিনার ওই বক্তব্যের ফলে বাংলাদেশে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়। দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক নতুন করে গড়ে তোলার বিষয়ে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ কতটা আন্তরিক, তা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে।” তিনি মনে করেন, হাসিনা দিল্লিতে থাকা অবস্থায় তারেক রহমানের সেখানে যাওয়াটা দেশের ভেতরে রাজনৈতিকভাবে ক্ষতির কারণ হতে পারে।

সম্পর্ক মেরামতে ভারতের আগ্রহের কারণ শুধু হাসিনা নন। বাংলাদেশের নতুন সরকার ভারতের চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী পাকিস্তানের সঙ্গেও সম্পর্ক পুনর্গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে। ঢাকা ও ইসলামাবাদ উচ্চপর্যায়ের সামরিক সফর করেছে এবং প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়ে প্রকাশ্যে আলোচনা করেছে। এই অগ্রগতি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে দিল্লি।

পাশাপাশি, সম্প্রতি সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে স্বাক্ষরিত ন্যাটো মডেলে গড়া ‘মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি’তে যোগ দেওয়ার ব্যাপারেও বাংলাদেশ আগ্রহ দেখিয়েছে। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির বিষয়টিকে ‘ইতিবাচক’ বলে উল্লেখ করেছেন। এসব ঘটনা ভারতকে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে যে, বাংলাদেশের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক বদলাচ্ছে এবং আগের মতো একচেটিয়া ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তারা আর উপভোগ করতে পারবে না।

অধ্যাপক ইয়াসমিনের মতে, সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশন শুরুর আগেই তারেক রহমানের দিল্লি সফর করা উচিত। শিগগিরই আরেকটি সুযোগও আসতে পারে সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি ভারত ব্রিকস সম্মেলনের আয়োজন করতে যাচ্ছে, যেখানে বাংলাদেশকে বিশেষ অতিথি হিসেবে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে।

কয়েক সপ্তাহ ধরে আমন্ত্রণ, জোর কূটনৈতিক তৎপরতা এবং ফাঁস হওয়া ই-মেইলের পর দিল্লি এখন তাকিয়ে আছে ঢাকার চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের দিকে। তারেক রহমান শেষ পর্যন্ত এই সফরে যাবেন কি না, তা সময়ই বলে দেবে।

ডিজিএন/এনএস

banner
Link copied!