ঢাকা শনিবার, ১৩ জুন, ২০২৬, ৩০ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
Daily Global News

বাজেট: অঙ্কের খেলা নয়, দেশের ভবিষ্যতের চুক্তি

ওমর ফারুক

প্রকাশিত: জুন ১১, ২০২৬, ১০:৩৭ পিএম

বাজেট: অঙ্কের খেলা নয়, দেশের ভবিষ্যতের চুক্তি

প্রতি বছর জুনের প্রথম বৃহস্পতিবার বাংলাদেশের অর্থনীতির ইতিহাসে নতুন একটি অধ্যায়ের সূচনা হয়। জাতীয় বাজেট পেশের দিনটি কেবল অর্থমন্ত্রীর দীর্ঘ পরিষদীয় ভাষণের আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি দেশের উন্নয়ন দর্শন, অর্থনৈতিক অগ্রাধিকার এবং সাধারণ মানুষের জীবনমানের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত। তাই বাজেটকে শুধু সংখ্যার সমষ্টি হিসেবে দেখলে এর প্রকৃত তাৎপর্য বোঝা যায় না। বরং সেই সংখ্যার পেছনে থাকা অর্থনৈতিক বাস্তবতা, সামাজিক প্রভাব এবং রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাকেও সমান গুরুত্ব দিয়ে বিশ্লেষণ করতে হয়।

বাজেট মূলত একটি দেশের আগামী এক অর্থবছরের সম্ভাব্য আয় ও ব্যয়ের সুবিন্যস্ত হিসাব। ব্যক্তিগত জীবনে আমরা সাধারণত আয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ব্যয়ের পরিকল্পনা করি। কিন্তু জাতীয় অর্থনীতির ক্ষেত্রে বিষয়টি এতটা সরল নয়। একটি রাষ্ট্রকে উন্নয়ন, অবকাঠামো নির্মাণ, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, সামাজিক নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য অনেক সময় তার আয়ের চেয়ে বেশি ব্যয়ের পরিকল্পনা করতে হয়। ফলে ঘাটতি বাজেট প্রণয়ন একটি স্বাভাবিক অর্থনৈতিক বাস্তবতা হয়ে দাঁড়ায়।

বাংলাদেশে বাজেটের সময়কাল ১ জুলাই থেকে পরবর্তী বছরের ৩০ জুন পর্যন্ত বিস্তৃত, যা একটি পূর্ণ অর্থবছর হিসেবে বিবেচিত হয়। সাধারণত জাতীয় বাজেট তিন ধরনের হয়ে থাকে উদ্বৃত্ত বাজেট, সুষম বাজেট এবং ঘাটতি বাজেট। উদ্বৃত্ত বাজেটে আয় ব্যয়ের চেয়ে বেশি থাকে, সুষম বাজেটে আয় ও ব্যয় সমান থাকে, আর ঘাটতি বাজেটে ব্যয় আয়ের চেয়ে বেশি হয়। বাংলাদেশ স্বাধীনতার পর থেকে প্রায় প্রতি বছরই ঘাটতি বাজেট পেশ করে আসছে। এই ঘাটতি পূরণে সরকারকে অভ্যন্তরীণ ঋণ, সঞ্চয়পত্র, ব্যাংকঋণ, কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে অর্থায়ন এবং বৈদেশিক ঋণ ও অনুদানের ওপর নির্ভর করতে হয়।

জাতীয় বাজেটের আয়ের প্রধান উৎস দুটি- রাজস্ব আয় এবং অরাজস্ব আয়। রাজস্ব আয়ের মধ্যে রয়েছে ভ্যাট, আয়কর, শুল্ক এবং বিভিন্ন ধরনের কর। অন্যদিকে অরাজস্ব আয়ের মধ্যে রয়েছে সরকারি প্রতিষ্ঠানের মুনাফা, অনুদান ও বৈদেশিক সহায়তা। ব্যয়ের ক্ষেত্রেও বাজেটকে প্রধানত দুটি ভাগে ভাগ করা হয়, উন্নয়ন ব্যয় এবং অনুন্নয়ন বা পরিচালন ব্যয়। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অবকাঠামো, কৃষি ও যোগাযোগ খাতে ব্যয় উন্নয়ন ব্যয়ের অন্তর্ভুক্ত, আর প্রশাসন পরিচালনা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, প্রতিরক্ষা এবং সরকারি ব্যবস্থাপনা পরিচালনার ব্যয় অনুন্নয়ন ব্যয়ের আওতায় পড়ে।

তবে বাজেটের এই কাঠামোর ভেতরে দীর্ঘদিন ধরে কিছু মৌলিক সমস্যা রয়ে গেছে। গত দেড় দশকের অভিজ্ঞতা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বাজেটের সবচেয়ে বড় বৈষম্যের জায়গা হলো রাজস্ব আহরণের পদ্ধতি। দেশের বাজেট আয়ের একটি বড় অংশ আসে মূল্য সংযোজন কর বা ভ্যাট থেকে, যা প্রত্যক্ষভাবে সাধারণ মানুষের ওপর চাপ সৃষ্টি করে। একজন দিনমজুর, রিকশাচালক কিংবা নিম্ন আয়ের মানুষ যখন সাবান, চাল, তেল বা নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য কিনছেন, তখন তিনিও ভ্যাট দিচ্ছেন। অথচ অনেক বড় ব্যবসায়ী, প্রভাবশালী করদাতা কিংবা করফাঁকিদাতারা নানা উপায়ে কর ব্যবস্থার বাইরে থেকে যাচ্ছেন। ফলে করব্যবস্থার ন্যায়সঙ্গত ভারসাম্য প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে না।

স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম অর্থমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ ১৯৭২ সালে ৭৮৬ কোটি টাকার বাজেট উপস্থাপন করেছিলেন। সেই বাজেট থেকে শুরু করে আজকের লাখ লাখ কোটি টাকার বিশাল বাজেটের যাত্রাপথ নিঃসন্দেহে অর্থনীতির সম্প্রসারণের সাক্ষ্য বহন করে। কিন্তু বাজেটের আকার যত বড় হয়েছে, ততই বেড়েছে কার্যকর বাস্তবায়ন, স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং বৈষম্য হ্রাসের প্রশ্ন।

বিগত বছরগুলোতে আমরা অনেক উচ্চাভিলাষী বাজেট দেখেছি, যেখানে প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ও উন্নয়ন পরিকল্পনার বড় বড় ঘোষণা ছিল। কিন্তু সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা কেবল বড় অঙ্কের বাজেট নয়; তারা এমন একটি বাজেট চায়, যা সহজ ভাষায় তাদের কাছে বোধগম্য হবে এবং তাদের জীবনমান উন্নয়নের বাস্তব প্রতিশ্রুতি দেবে। কৃষক, শ্রমিক, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা, শিক্ষক, শিক্ষার্থী কিংবা চাকরিজীবী প্রত্যেকে যেন বুঝতে পারে জাতীয় অর্থনীতির পরিকল্পনায় তার অবস্থান কোথায়।

বাজেটকে শুধু অর্থনীতিবিদ, গবেষক কিংবা নীতিনির্ধারকদের আলোচনার বিষয় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। কারণ বাজেটের প্রতিটি সিদ্ধান্ত প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে নাগরিক জীবনে প্রভাব ফেলে। করের হার, দ্রব্যমূল্য, শিক্ষা ব্যয়, স্বাস্থ্যসেবা, কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ কিংবা সামাজিক নিরাপত্তা সবকিছুর সঙ্গে বাজেটের নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। তাই বাজেট সম্পর্কে সচেতন হওয়া প্রতিটি নাগরিকের দায়িত্ব।

অবশেষে বলা যায়, বাজেট কেবল অঙ্কের খেলা নয়; এটি একটি জাতির ভবিষ্যতের সঙ্গে করা চুক্তি। সেই চুক্তির সার্থকতা নির্ভর করে সাধারণ মানুষের জীবনমান কতটা উন্নত হলো, বৈষম্য কতটা কমল, কর্মসংস্থান কতটা বাড়ল এবং রাষ্ট্রের উন্নয়ন দর্শন কতটা বাস্তবে রূপ পেল তার ওপর। বাজেট যদি শুধু কাগজে-কলমে উচ্চাভিলাষী সংখ্যার সমাহার হয়ে থাকে, তবে তা জনগণের কাছে অর্থহীন। কিন্তু যদি তা মানুষের জীবনকে সহজ, নিরাপদ ও সম্ভাবনাময় করে তুলতে পারে, তবেই বাজেট তার প্রকৃত উদ্দেশ্য পূরণ করবে।

বাজেট পেশের দিনকে তাই কেবল একটি আনুষ্ঠানিক অনুষ্ঠান হিসেবে নয়, বরং জাতির ভবিষ্যৎ নির্মাণের অঙ্গীকার হিসেবে দেখার সময় এসেছে। কারণ বাজেটের প্রতিটি সংখ্যা, প্রতিটি সিদ্ধান্ত এবং প্রতিটি অগ্রাধিকার শেষ পর্যন্ত দেশের প্রতিটি মানুষের জীবনকেই স্পর্শ করে।

লেখক: গণমাধ্যমকর্মী

ডিজিএন/এফএ

banner
Link copied!