ঢাকা মঙ্গলবার, ১৪ এপ্রিল, ২০২৬, ১ বৈশাখ ১৪৩৩
Daily Global News

এপ্রিল ফুল: ট্র্যাজেডির গুজব বনাম ইতিহাসের সত্যতা

ওমর ফারুক

প্রকাশিত: এপ্রিল ১, ২০২৬, ০১:৪৬ পিএম

এপ্রিল ফুল: ট্র্যাজেডির গুজব বনাম ইতিহাসের সত্যতা

পহেলা এপ্রিল-বিশ্বজুড়ে দিনটি ‘এপ্রিল ফুলস ডে’ বা ‘বোকা বানানোর দিন’ হিসেবে পরিচিত। আনন্দ, কৌতুক আর নিছক রসিকতার মধ্য দিয়ে দিনটি পার করলেও আমাদের সমাজের একটি বড় অংশের মধ্যে এই দিনটিকে ঘিরে রয়েছে এক ভয়াবহ ও শোকাতুর বিশ্বাস। বিশেষ করে মুসলিম বিশ্বের অনেক জায়গায় প্রচার করা হয় যে, ১৪৯২ সালে স্পেনের গ্রানাডায় মুসলমানদের মসজিদে আটকে পুড়িয়ে মারার এক ট্র্যাজেডি থেকেই এই দিবসের শুরু। কিন্তু ইতিহাসের নির্মোহ দলিলে এই দাবির কতটুকু ভিত্তি আছে? নাকি আমরা অনিচ্ছাকৃতভাবেই একটি ঐতিহাসিক ভুল বা গুজবকে বয়ে বেড়াচ্ছি?

প্রথমেই স্পেনের সেই বহুল আলোচিত ট্র্যাজেডির দিকে তাকানো যাক। প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, ১ এপ্রিল গ্রানাডার মুসলমানদের নিরাপদ আশ্রয়ের কথা বলে মসজিদে ঢুকিয়ে পুড়িয়ে মারা হয়েছিল। তবে ঐতিহাসিক গবেষণা ও তথ্যসূত্র বলছে অন্য কথা। আধুনিক ইতিহাসবিদদের মতে, গ্রানাডার পতন হয়েছিল ১৪৯২ সালের ২ জানুয়ারি, এপ্রিল মাসে নয়। স্পেনের সেই যুদ্ধের নথিপত্রে পহেলা এপ্রিলে এমন কোনো নারকীয় হত্যাকাণ্ডের সুনির্দিষ্ট প্রমাণ মেলেনি। মূলত আবেগতাড়িত হয়ে কোনো এক সময়ে এই ভুল তথ্যটি ছড়িয়ে পড়েছিল, যা আজও অনেককে বিভ্রান্ত করে।

তাহলে ‘এপ্রিল ফুলস ডে’-র প্রকৃত উৎস কী? ইতিহাসবিদদের কাছে সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য তত্ত্বটি হলো ক্যালেন্ডার বা পঞ্জিকার পরিবর্তন। ১৫৬৪ সালে ফ্রান্সের সম্রাট নবম চার্লস ঘোষণা করেন যে, নতুন বছর আর পহেলা এপ্রিল থেকে নয়, বরং শুরু হবে ১ জানুয়ারি থেকে। সেই যুগে আজকের মতো দ্রুতগামী যোগাযোগব্যবস্থা ছিল না। ফলে বহু মানুষ এই পরিবর্তনের খবর পাননি অথবা পুরনো প্রথা আঁকড়ে ধরে ১ এপ্রিলই নববর্ষ উদযাপন করতে থাকেন। যারা নতুন ক্যালেন্ডার গ্রহণ করেছিলেন, তারা এই ‘অজ্ঞ’ বা ‘পুরোনোপন্থীদের’ বিদ্রূপ করে ‘এপ্রিলের বোকা’ বলে ডাকতে শুরু করেন। ফ্রান্সে এই দিনটি ‘এপ্রিল ফিশ’ নামেও পরিচিত, যেখানে মজার ছলে একজনের অজান্তে পিঠে কাগজের মাছ আটকে দেওয়া হয়।

ইংরেজ সাহিত্যের আদি পিতা জিওফ্রে চসারের ‘দ্য নানস প্রিস্টস টেল’ কবিতাতেও এই দিবসের পরোক্ষ ইঙ্গিত পাওয়া যায়। সেখানে একটি মোরগ ও শিয়ালের একে অপরকে বোকা বানানোর গল্পের একটি তারিখকে অনেক পণ্ডিত পহেলা এপ্রিল হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। আবার প্রাচীন রোমের ‘হিলারিয়া’ উৎসবের সঙ্গেও এর সাদৃশ্য খুঁজে পাওয়া যায়, যেখানে মানুষ ছদ্মবেশ ধারণ করে সামাজিক মর্যাদার পার্থক্য ভুলে একে অপরকে কৌতুকের মাধ্যমে আনন্দ দিত।

ইতিহাসে এই দিনটিকে ঘিরে বড় বড় ‘প্র্যাঙ্ক’ বা রসিকতার নজিরও কম নয়। ১৬৯৮ সালে লন্ডনে টাওয়ার অফ লন্ডনে ‘সিংহের গোসল’ দেখানোর আমন্ত্রণ জানিয়ে হাজারো মানুষকে বোকা বানানো হয়েছিল। আবার ১৯৫৭ সালে খোদ বিবিসি একটি প্রতিবেদনে দেখিয়েছিল যে সুইজারল্যান্ডের গাছে ‘স্প্যাগেটি’ বা নুডলস ফলছে! হাজার হাজার মানুষ সেই খবর বিশ্বাস করে বিবিসির দপ্তরে ফোন করেছিলেন যে কীভাবে তারা বাড়িতে এমন গাছ লাগাতে পারেন।

আজকের ‘ডিপ ফেক’ আর ‘ফেক নিউজ’-এর যুগে পহেলা এপ্রিল পালন করতে বাড়তি সতর্কতার প্রয়োজন পড়ে। তবে ঐতিহাসিকভাবে এটি কোনো ধর্মীয় শোকগাথা নয়, বরং দীর্ঘকাল ধরে চলে আসা এক বৈশ্বিক লোকপ্রথা। ইতিহাসকে আবেগের চশমায় না দেখে তথ্যের ভিত্তিতে বিচার করাই বুদ্ধিমানের কাজ। এপ্রিল ফুল কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠীকে অপদস্থ করার দিন নয়, বরং এটি মানবীয় হাস্যরস আর প্রকৃতির খামখেয়ালি পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার এক প্রাচীন রীতি মাত্র। আমাদের মনে রাখা প্রয়োজন, গুজব কোনো জাতিকে মহান করে না, বরং সত্য ইতিহাসই আমাদের সঠিক পথ দেখায়।

ওমর ফারুক, গণমাধ্যমকর্মী।

ডিজিএন/এফএ

banner
Link copied!