ইরান যুদ্ধের উত্তাপ এখন বাংলাদেশের পেট্রোল পাম্প থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের রান্নাঘর পর্যন্ত পৌঁছেছে। তেলের পাম্পগুলোতে যানবাহনের মাইলের পর মাইল দীর্ঘ লাইন, ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা আর লোডশেডিংয়ের অন্ধকার সব মিলিয়ে এক অস্থির সময় পার করছে দেশ। সরকার পর্যাপ্ত মজুতের দাবি করলেও বাস্তব চিত্র বলছে ভিন্ন কথা। কেন এই সংকট এবং এর প্রভাব কতটা গভীর, তা নিয়ে চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ।
জ্বালানি ও বিদ্যুৎ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ দাবি করেছেন যে, দেশে আগামী দুই মাসের বেশি সময়ের তেল মজুত আছে। তবুও পাম্পগুলোতে কেন হাহাকার? বিশ্লেষকদের মতে, সরকারের ‘রেশনিং’ ব্যবস্থা চালুর ঘোষণা মানুষের মনে আতঙ্ক তৈরি করেছে। মানুষ প্রয়োজনের চেয়ে বেশি তেল কিনে মজুত করতে শুরু করায় তৈরি হয়েছে কৃত্রিম সংকট। এর সাথে যুক্ত হয়েছে এক শ্রেণির অসাধু কালোবাজারি চক্র, যারা পাম্প থেকে বারবার তেল সংগ্রহ করে চড়া দামে বিক্রি করছে।
জ্বালানি তেলের এই সংকট সরাসরি আঘাত হেনেছে বিদ্যুৎ উৎপাদনে। বর্তমানে দেশে প্রায় ৩০০০ মেগাওয়াট বিদ্যুতের ঘাটতি রয়েছে। ১৩৬টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মধ্যে গ্যাস ও তেলের অভাবে প্রায় ২৭টি কেন্দ্র বন্ধ রয়েছে।
গ্রামাঞ্চলে বিপর্যয়: ঢাকার বাইরে জেলা-উপজেলায় ৭-৮ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং হচ্ছে। সেচ সংকট: ডিজেল সংকটে বোরো আবাদের সেচ কাজ ব্যাহত হচ্ছে। এতে কৃষি উৎপাদন কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, যার চূড়ান্ত প্রভাব পড়বে নিত্যপণ্যের বাজারে।
ইরান যুদ্ধের কারণে বিশ্ববাজারে তেলের দাম আকাশচুম্বী। বিকল্প উৎস ও খোলা বাজার থেকে তেল সংগ্রহ করতে বাংলাদেশকে অতিরিক্ত ৩৭ হাজার কোটি টাকা গুণতে হচ্ছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, এই বিশাল ব্যয় মেটাতে গিয়ে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে টান পড়বে এবং সামগ্রিক অর্থনীতি চাপের মুখে পড়বে। বিশ্বব্যাংক ইতিমধ্যে সতর্ক করেছে যে, এই সংকটের ফলে বাংলাদেশে নতুন করে ১২ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যেতে পারে।
দুই মাস বয়সী বিএনপি সরকারের জন্য এটি একটি বড় অগ্নিপরীক্ষা। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানিয়েছেন, দ্রব্যমূল্য সহনীয় রাখতে ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ডের মতো সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি জোরদার করা হচ্ছে। সংকট মোকাবিলায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রস্তাবে সরকারি ও বিরোধী দলের সদস্যদের নিয়ে একটি সংসদীয় কমিটি গঠন করা হয়েছে।
তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, কেবল কমিটি গঠন নয়, বরং জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা এবং কালোবাজারি রোধে কঠোর অভিযান এখন সময়ের দাবি। সূত্র: বিবিসি।


আপনার মতামত লিখুন :