প্রতি বছর জুনের প্রথম বৃহস্পতিবার বাংলাদেশের অর্থনীতির কাগজপত্রে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়। জাতীয় বাজেট পেশের দিনটি কেবল অর্থমন্ত্রীর পরিষদীয় ভাষণের আনুষ্ঠানিকতা নয় এটি দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন দর্শন, অর্থনৈতিক অগ্রাধিকার এবং সাধারণ মানুষের জীবনমানের ভবিষ্যতের এক বাস্তব রূপরেখা।
কিন্তু বাজেটের আদ্যোপান্ত বুঝতে গেলে শুধু বিশাল সংখ্যার খেলা দেখলেই চলে না, গভীর নজর দেওয়া দরকার সেই সংখ্যার পেছনের আর্থ-সামাজিক বাস্তবতার ওপর। বাজেট হলো মূলত একটি দেশের আগামী এক বছরের সম্ভাব্য আয় ও ব্যয়ের সুবিন্যস্ত হিসাব।
ব্যক্তিগত জীবনে আমরা সাধারণত আয় অনুযায়ী ব্যয়ের ক্ষেত্র নির্ধারণ করলেও, জাতীয় বাজেটের ক্ষেত্রে চিত্রটি ভিন্ন। অপ্রত্যাশিত পরিস্থিতি, প্রাকৃতিক দুর্যোগ কিংবা অর্থনৈতিক সংকটের কারণে বছর শেষে আয়-ব্যয়ের অসামঞ্জস্য দেখা দেওয়া খুব স্বাভাবিক। আর এই কারণেই প্রতি বছর জাতীয় বাজেটে আয়ের চেয়ে ব্যয় বেশি ধরে ‘ঘাটতি বাজেট’ প্রণয়ন করা হয়।
উল্লেখ্য, বাংলাদেশের বাজেটের সময়কাল ১ জুলাই থেকে পরবর্তী ৩০ জুন পর্যন্ত, যা একটি পূর্ণ অর্থবৎসর হিসেবে গণ্য হয়। ১৭২০ সালে ব্রিটেনের পার্লামেন্টে স্যার রবার্ট ওয়ালপোল প্রথম এই ধারণার অবতারণা করেন, যার নামকরণ হয়েছিল `বোগেটি` বা মানিব্যাগ শব্দ থেকে।
সাধারণত জাতীয় বাজেট তিন ধরনের হয়ে থাকে। প্রথমটি উদ্বৃত্ত বাজেট, যেখানে মোট আয় ব্যয়ের চেয়ে বেশি থাকে এবং এটি মূলত উন্নত ও পর্যাপ্ত কর্মসংস্থানের দেশগুলোর জন্য উপযোগী। দ্বিতীয়টি সুষম বাজেট, যেখানে মোট আয় ও ব্যয় সমান থাকে, তবে এর বাস্তবিক প্রয়োগ অত্যন্ত কষ্টসাধ্য। আর তৃতীয়টি হলো ঘাটতি বাজেট, যেখানে মোট আয়ের চেয়ে মোট ব্যয়ের পরিমাণ বেশি থাকে।
বাংলাদেশ প্রায় প্রতি বছরই এই ঘাটতি বাজেট পেশ করে থাকে এবং এই ঘাটতি পূরণের লক্ষ্যে সরকারকে জনসাধারণের কাছ থেকে ঋণ, নতুন অর্থ সৃষ্টি, কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ঋণ গ্রহণ এবং বৈদেশিক ঋণ ও অনুদানের ওপর নির্ভর করতে হয়।
এই বাজেটের আয়ের কাঠামো মূলত ভ্যাট, কর ও শুল্কের মতো রাজস্ব আয় এবং অনুদান ও ঋণের মতো অরাজস্ব আয়ের ওপর ভিত্তি করে দাঁড়ায়। অন্যদিকে ব্যয় কাঠামোটি বিভক্ত থাকে দুই ভাগে একটি হলো শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও রাস্তাঘাটের মতো উন্নয়ন বাজেট এবং অন্যটি হলো দেশ রক্ষা, আইনশৃঙ্খলা ও প্রশাসন পরিচালনার মতো অনুন্নয়ন বাজেট।
তবে দেশের বাজেট কাঠামোর ভেতরে দীর্ঘদিনের কিছু পুঞ্জীভূত সমস্যা রয়ে গেছে। গত দেড় দশকেরও বেশি সময়ের অভিজ্ঞতার সারসংক্ষেপে জাতীয় বাজেটের প্রধান আটটি কাঠামোগত সমস্যা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় বৈষম্য বা না-ইনসাফির জায়গা হলো, বাজেটের আয়ের সিংহভাগই তুলে আনতে হয় সাধারণ মানুষের পকেট থেকে মূল্য সংযোজন কর বা ভ্যাটের মাধ্যমে।
একটি সাবান, চাল বা তেলের প্যাকেট কেনার সময় একজন দিনমজুর বা রিকশাচালকও যেভাবে সমহারে ভ্যাট দিচ্ছেন, সেই তুলনায় বড় বড় ব্যবসায়ীরা করচক্রের বাইরে থেকে যাচ্ছেন।
স্বাধীনতার পর তাজউদ্দীন আহমদের দেওয়া প্রথম ৭৮৬ কোটি টাকার বাজেট থেকে শুরু করে বর্তমান সময়ের লাখ লাখ কোটি টাকার বাজেটের যে বিশাল রূপান্তর ঘটেছে, সেখানে এই অসাম্যই রয়ে গেছে মূল সংকট হিসেবে।
বিগত বছরগুলোর উচ্চাভিলাষী বাজেটের পর বর্তমান সময়ে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা হলো, বাজেট যেন শুধু সংখ্যার চাতুর্য না হয়ে অত্যন্ত পরিষ্কার ও সরলভাবে উপস্থাপিত হয়। অর্থনীতির প্রতিটি খাতের মানুষ যেন বুঝতে পারে দেশের নীতিতে তার অবস্থান কোথায়।
বাজেট কেবল অর্থনীতিবিদদের আলোচনার বিষয় নয়, এটি প্রতিটি নাগরিকের জীবনের সাথে সরাসরি যুক্ত। এটি যদি শুধু উচ্চাভিলাষী অঙ্কের খেলা হয় তবে তা সাধারণ মানুষের কাছে অর্থহীন, আর যদি তা জনমানুষের জীবনমানের উন্নয়ন ও স্বস্তি নিশ্চিত করতে পারে, তবেই তা সার্থক চুক্তি হিসেবে গণ্য হবে।


আপনার মতামত লিখুন :