বাংলাদেশ ও ভারতের দীর্ঘ সীমান্তজুড়ে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বা বিএসএফের ‘পুশ ইন’ বা ‘পুশ ব্যাক’ করার চেষ্টা নিয়ে তীব্র উত্তেজনা বিরাজ করছে। গত মে মাসের শেষ দিক থেকে জুনের প্রথম ভাগ পর্যন্ত দেশের অন্তত ২০টি পয়েন্ট দিয়ে প্রায় ২০০ জন মানুষকে বিএসএফ জোরপূর্বক বাংলাদেশের দিকে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করেছে বলে জানিয়েছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)।
প্রতিটি ক্ষেত্রেই বিজিবি সদস্যদের পাশাপাশি সীমান্তের স্থানীয় বাসিন্দারা একজোট হয়ে তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তোলায় কেউ বাংলাদেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করতে পারেনি। তবে এই পুশ ইনকে কেন্দ্র করে দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মধ্যে যেমন ঘন ঘন পতাকা বৈঠক ও উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় হচ্ছে, তেমনি বাংলাদেশের বিক্ষুব্ধ সাধারণ মানুষ কর্তৃক বিএসএফ সদস্যদের ধাওয়া করার ঘটনাও ঘটেছে।
বিজিবির দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলের রিজিয়ন কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মাহমুদুল হাসান বিএসএফের এই পুশ ইনের কৌশল বা প্যাটার্ন ব্যাখ্যা করে জানান, ভারতের সীমান্তের কাঁটাতারের বেড়া বরাবর তাদের সীমান্ত সড়ক রয়েছে এবং বেড়ার বিভিন্ন জায়গায় রয়েছে গেট। বিএসএফ রাতের আঁধারে বড় গাড়িতে করে মানুষ নিয়ে এসে প্রথমে ওই এলাকার সীমান্তের হাইভোল্টেজ লাইটগুলো বন্ধ করে দেয়।
লাইট বন্ধ হওয়াই পুশ ইনের সবচেয়ে বড় সংকেত। এরপর কোনো একটি গেট খুলে দিয়ে সম্পূর্ণ লাইট বন্ধ অবস্থায় অন্ধকারের সুযোগ নিয়ে মানুষকে বাংলাদেশের দিকে ঠেলে দেওয়া হয়।
এই পুশ ইনের কারণে সীমান্তের নো ম্যানস ল্যান্ডগুলোতে সৃষ্টি হয়েছে চরম মানবিক সংকট। যশোরের বেনাপোল সীমান্তের সাদিপুর ও রঘুনাথপুর এলাকায় ৩১শে মে মধ্যরাতে বিএসএফ কর্তৃক ১০ থেকে ১২ জনের একটি দলকে কাঁটাতারের বেড়ার গেট দিয়ে পুশ ইন করার চেষ্টা করা হয়।
তবে বিজিবি সদস্যরা টর্চ লাইট ও মাইকিং করে বাধা দেওয়ায় জৈষ্ঠ্যের তীব্র গরমের মাঝে নো ম্যানস ল্যান্ডে আটকা পড়েন তারা। একই ধরনের পরিস্থিতি দেখা যায় চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুরের বাঙ্গাবাড়ী সীমান্তেও, যেখানে ৩রা জুন ভোররাতে ২৮ জন মানুষকে পুশ ইন করার চেষ্টা করা হলে স্থানীয় ২০-৩০ জন নারী-পুরুষ ও বিজিবি মিলে তাদের আটকে দেয়।
পরবর্তীতে বিএসএফের সাথে কয়েক দফা আলোচনার পর ৬ই জুন রাতে লাইট বন্ধ করে আটকে পড়া ব্যক্তিদের আবার নিজেদের সীমান্তে ফিরিয়ে নেয় বিএসএফ। মে মাসের শেষদিকে সাতক্ষীরার কলারোয়া সীমান্তে ভারতের অংশে কয়েকশো মানুষ জড়ো হওয়ার খবর পাওয়ার পর থেকেই মূলত ঝিনাইদহ, যশোর, নওগাঁও, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও পঞ্চগড়সহ পশ্চিমবঙ্গের সীমান্তবর্তী সব জেলাতেই সর্বোচ্চ নজরদারি বাড়িয়েছে বিজিবি।
বিজিবির এই সফল পুশ ইন প্রতিরোধের পেছনে সবচেয়ে বড় শক্তি হিসেবে কাজ করছে স্থানীয় সাধারণ মানুষ। বিজিবি বিভিন্ন সীমান্ত এলাকার স্কুল, মসজিদ ও বাজারে নিয়মিত মাইকিং করে পুশ ইনের সম্ভাব্য লক্ষণগুলো সম্পর্কে স্থানীয়দের সতর্ক করার সুফল পাচ্ছে।
যেমন বাঙ্গাবাড়ী সীমান্তে ৩রা জুন মধ্যরাতে লাইট বন্ধ হওয়ার খবর বিজিবি প্রথম পায় স্থানীয় বাজারের একজন চৌকিদারের কাছ থেকে এবং সীমান্তের একেবারে কাছে বাড়ি হওয়ায় তাঁর পরিবারের নারীরাই সবার আগে এগিয়ে গিয়ে পুশ ইন হওয়া নারীদের ভারতের দিকে ঠেলে দেয়।
শুধু তাই নয়, জুনের শুরুতে লালমনিরহাটে এবং ১০ই জুন জামালপুর সীমান্তে বিজিবি ও বিএসএফের মধ্যে কথা কাটাকাটির এক পর্যায়ে স্থানীয় গ্রামবাসীরা সংঘবদ্ধ হয়ে বিএসএফ সদস্যদের ধাওয়া দিয়ে ভারতের সীমানার দিকে তাড়িয়ে দেয়।
বর্তমানে অনেক সীমান্তেই সাধারণ মানুষ রাত জেগে বিজিবির সাথে পাহারায় অংশ নিচ্ছে, কারণ বিজিবির মতে বিপুল সংখ্যক সাধারণ মানুষের উপস্থিতি দেখলে বিএসএফ পুশ ইন করা থেকে বিরত থাকে।
সীমান্তবর্তী মানুষেরা নো ম্যানস ল্যান্ডে আটকে থাকা মানুষদের প্রতি সহানুভূতিশীল এবং তাদের অনেকেই বাংলাদেশের নাগরিক হওয়ায় ফিরিয়ে নেওয়ার পক্ষে, তবে তাদের স্পষ্ট দাবি বিএসএফের এই জোরপূর্বক ‘পুশ ইন’ প্রক্রিয়া বন্ধ করে যা করার তা যেন সম্পূর্ণ আইনসম্মত উপায়ে করা হয়।
অবশ্য বিজিবির এই ভূরি ভূরি অভিযোগের প্রেক্ষিতে বিএসএফ আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো মন্তব্য না করলেও, পতাকা বৈঠকগুলোতে তারা পুশ ইনের দায় সম্পূর্ণ অস্বীকার করে দাবি করেছে যে জিরো লাইনে আটকে থাকা ব্যক্তিরা কীভাবে এসেছে তা তারা জানে না এবং তারা মূলত বাংলাদেশেরই নাগরিক। সূত্র: বিবিসি


আপনার মতামত লিখুন :