যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান যুদ্ধ থামানোর লক্ষ্যে একটি ঐতিহাসিক চুক্তি স্বাক্ষরের দ্বারপ্রান্তে রয়েছে ইরান। এই চুক্তির মূল শর্ত অনুযায়ী, বিশ্ব অর্থনীতি ও জ্বালানি পরিবহনের জন্য কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি আবার আন্তর্জাতিক চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া হবে।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি দেশটির রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনকে জানিয়েছেন, এই চুক্তির আওতায় তেহরানের ওপর থেকে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা ও নৌ-পরিবহন অবরোধ প্রত্যাহারের বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে। তবে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে সবচেয়ে সংবেদনশীল আলোচনাটি পরবর্তী সময়ে শুরু হবে।
মার্কিন কর্মকর্তারাও এই চুক্তির বেশ কিছু তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তবে ওয়াশিংটন স্পষ্ট করে জানিয়েছে, ইরান কোনো আগাম অর্থনৈতিক সুবিধা পাবে না, বরং তেহরান তাদের দেওয়া প্রতিশ্রুতি কতটা বাস্তবায়ন করছে, তার ওপর ভিত্তি করে ধাপে ধাপে তাদের অবরুদ্ধ তহবিল অবমুক্ত করা হবে এবং বিশ্ব অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত হওয়ার সুযোগ দেওয়া হবে।
এর আগে গত বৃহস্পতিবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানান যে দুই পক্ষের আলোচকেরা একটি ‘চমৎকার সমঝোতায়’ পৌঁছেছেন এবং খুব শিগগিরই এই চুক্তি সই হতে পারে, যার কারণে তিনি ইরানের ওপর পূর্বনির্ধারিত কিছু সামরিক হামলা বাতিল করেছেন।
তবে গতকাল শুক্রবার ইরানি গণমাধ্যমে একটি ১৪ দফা চুক্তির বিবরণ প্রকাশ করা হলে ট্রাম্প তা পুরোপুরি নাকচ করে দিয়ে বলেন, ওই তথ্যের কোনো ভিত্তি নেই। এর কয়েক ঘণ্টা পর এই চুক্তির অন্যতম মধ্যস্থতাকারী দেশ পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ জানান, যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) চূড়ান্ত হয়েছে এবং এটি এখন অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।
উল্লেখ্য, পাকিস্তান ও কাতারের মধ্যস্থতায় হওয়া এই চুক্তির লক্ষ্য হলো মূলত যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়ানো এবং ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিসহ প্রধান বিষয়গুলো নিয়ে নতুন করে আলোচনার দুয়ার খোলা, যদিও এই পুরো প্রক্রিয়ায় তাদের অন্যতম প্রধান মিত্র ইসরায়েল অংশ নেয়নি।

অপরদিকে, ইরানের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা পর্ষদ ‘সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিল’-এর সদস্যদের মধ্যে এই চুক্তির শর্তাবলী নিয়ে তীব্র পক্ষে-বিপক্ষে মত থাকায় এখনো কোনো সম্মিলিত চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব হয়নি বলে জানিয়েছেন ইরানি পররাষ্ট্রমন্ত্রী।
চলতি বছরের ২৮শে ফেব্রুয়ারি ইরানজুড়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ সামরিক অভিযান ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ শুরুর মধ্য দিয়ে এই রক্তক্ষয়ী সংঘাতের সূত্রপাত হয়েছিল। এর জবাবে ইরানও পাল্টা আঘাত হানে এবং আন্তর্জাতিক তেল পরিবহনের প্রধান পথ হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেয়।
গত এপ্রিলে একটি প্রাথমিক যুদ্ধবিরতি হলেও চলতি সপ্তাহেও উভয় পক্ষ দুই দফায় একে অপরের ওপর হামলা চালিয়েছে।
মার্কিন কর্মকর্তারা এক ব্রিফিংয়ে জানিয়েছেন, চুক্তি স্বাক্ষরের সাথে সাথেই হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া এবং ইরানের নৌ-অবরোধ প্রত্যাহারের পদক্ষেপগুলো কার্যকর হবে। এরপরই শুরু হবে ৬০ দিনের একটি জটিল আলোচনা প্রক্রিয়া, যার মূল কেন্দ্রবিন্দু হবে পারমাণবিক বোমার প্রধান উপাদান তথা ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম ধ্বংস বা দেশ থেকে সরিয়ে নেওয়া।
একই সঙ্গে এই চুক্তিতে মধ্যপ্রাচ্যের হিজবুল্লাহসহ অন্যান্য প্রক্সি গোষ্ঠীগুলোকে ইরানের অর্থায়ন বন্ধ করার আহ্বান জানানো হয়েছে। ওয়াশিংটন স্পষ্ট করে দিয়েছে যে এই চুক্তি কোনো অন্ধ বিশ্বাসের ওপর নয়, বরং কাজের প্রমাণের ওপর ভিত্তি করে তৈরি হয়েছে। যদিও গত দুই মাসে বেশ কয়েকবার চুক্তির কাছাকাছি গিয়েও শেষ মুহূর্তে তা ভেস্তে গিয়েছিল, তবুও এবার দুই পক্ষসহ মধ্যস্থতাকারী দেশগুলোর মধ্যে একটি সতর্ক আশাবাদ দেখা যাচ্ছে। সূত্র: বিবিসি


আপনার মতামত লিখুন :