ঢাকা সোমবার, ২৫ মে, ২০২৬, ১০ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
Daily Global News

তারেক রহমানের শিক্ষাজীবন: স্মৃতি, সত্য আর রাজনৈতিক সুবিধাবাদের মুখোমুখি

ওমর ফারুক

প্রকাশিত: মে ১৫, ২০২৬, ০৩:১৩ পিএম

তারেক রহমানের শিক্ষাজীবন: স্মৃতি, সত্য আর রাজনৈতিক সুবিধাবাদের মুখোমুখি

তারেক রহমানের শিক্ষাজীবন নিয়ে সাম্প্রতিক আলোচনা আমাদের আবারও মনে করিয়ে দিচ্ছে বাংলাদেশে রাজনীতি প্রায়ই সত্যকে ছাপিয়ে যায়, আর মানুষকে বিচার করা হয় তাঁর কাজ দিয়ে নয়, তাঁর নাম দিয়ে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, সহপাঠী ও প্রত্যক্ষদর্শীদের স্মৃতিতে যে তরুণটির ছবি উঠে আসছে, তা কোনো প্রচারযন্ত্রের বানানো চরিত্র নয়; বরং এক উত্তাল সময়ের ভেতর দিয়ে হেঁটে যাওয়া একজন ছাত্রের বাস্তব গল্প।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কোনো স্বাভাবিক সময়ের ক্যাম্পাস ছিল না আশির দশকের মাঝামাঝি। তখন সেখানে ক্লাসের চেয়ে মিছিল বেশি, পরীক্ষার চেয়ে উত্তেজনা বেশি, আর ভবিষ্যতের চেয়ে ভয় বেশি ছিল। এরশাদবিরোধী রাজনীতি, নিরাপত্তাঝুঁকি, সেশনজট, অস্ত্রের উপস্থিতি সব মিলিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়টি ছিল এক অস্থির ভূখণ্ড। সেই সময়ে কারও শিক্ষাজীবন অসম্পূর্ণ থেকে গেলে সেটি শুধু ব্যক্তিগত ঘটনা নয়; সেটি সময়ের নির্মম দলিল। তারেক রহমানের শিক্ষাজীবনও সেই বাস্তবতার বাইরে নয়।

প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, তিনি প্রথমে আইন বিভাগে ভর্তি হন, পরে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগে মাইগ্রেশন করেন। এ ধরনের বিভাগ পরিবর্তন কোনো অস্বাভাবিক ঘটনা নয়। কিন্তু তার ক্ষেত্রে এটিকে ঘিরে যে বিভ্রান্তি তৈরি করা হচ্ছে, তা রাজনৈতিক ব্যাখ্যার চেয়েও বেশি বিদ্বেষের বহিঃপ্রকাশ। একজন মানুষ কোথায় ভর্তি হয়েছিলেন, কোথায় শেষ করতে পারেননি, কেন পারেননি এসব প্রশ্নের উত্তর নথি, শিক্ষক ও সহপাঠীর স্মৃতিতে আছে। মুশকিল হলো, আমাদের রাজনীতিতে অনেকেই তথ্য খোঁজেন না; তাঁরা খোঁজেন আঘাত করার উপযোগী অস্ত্র।

অধ্যাপক নুরুল আমিন বেপারীর স্মৃতিচারণ এ বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর ভাষ্যে তারেক রহমান ছিলেন বিনয়ী, শান্ত, মার্জিত ও নিয়মিত প্রশ্নকারী ছাত্র। তিনি প্রোটোকলের আড়ালে থাকা কোনো বিশেষ সুবিধাভোগী ছিলেন না; বরং সাধারণ শিক্ষার্থীর মতো প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দিয়ে ভর্তি হয়েছিলেন। এটাই সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ, একজন প্রভাবশালী পরিবারের সন্তান হয়েও যদি কেউ বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে সাধারণ ছাত্রের মতো আচরণ করেন, তাহলে সেটি ন্যূনতমভাবে স্বীকার করা উচিত। রাজনীতির কুয়াশা যেন সেই স্বীকৃতিকে গিলে না ফেলে।

তারেক রহমানের অনার্স সম্পন্ন না হওয়ার কারণ হিসেবে শিক্ষক ও সমসাময়িকরা রাজনৈতিক অস্থিরতা ও নিরাপত্তাঝুঁকির কথা বলছেন। এই ব্যাখ্যা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। বরং এটিই আমাদের সময়ের বড় সত্য বাংলাদেশে বহু মেধাবী তরুণ তাদের শিক্ষাজীবন শেষ করতে পারেননি রাজনৈতিক সহিংসতা, ভাঙা শৃঙ্খলা আর অনিশ্চিত ভবিষ্যতের কারণে। বিশ্ববিদ্যালয় যদি জ্ঞানচর্চার জায়গা হয়, তাহলে রাষ্ট্রের দায়িত্ব ছিল সেই পরিবেশ রক্ষা করা। কিন্তু বাস্তবে রাষ্ট্রই বারবার ক্যাম্পাসকে অস্থিরতার মঞ্চে পরিণত করেছে। সেই দায় কি একজন ছাত্রের ঘাড়ে চাপানো যায়?

এখানে আরেকটি বিষয় খুব স্পষ্টভাবে বলা দরকার তারেক রহমান নিজে কখনো ভুয়া ডিগ্রির দাবি করেছেন বলে প্রমাণ পাওয়া যায় না। তাঁর হলফনামায় যদি এইচএসসি পাস লেখা থাকে, সেটাই প্রমাণ করে তিনি নিজের অসমাপ্ত শিক্ষাজীবন নিয়ে মিথ্যার আশ্রয় নেননি। এ সৎ অবস্থানকে অবজ্ঞা করা উচিত নয়। আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে এটি বিরল, কারণ অনেকেই অসম্পূর্ণ সত্যকে পূর্ণ মিথ্যায় রূপ দেন। তারেক রহমান সে পথ নেননি এটুকু স্বীকার করতে অসুবিধা কোথায়?

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ও বর্তমান শিক্ষার্থীদের স্মৃতিও এই সত্যকে জোরালো করে। কেউ বলেছেন, তিনি আইন বিভাগে কয়েক মাস ক্লাস করেছিলেন। কেউ বলেছেন, তিনি রাষ্ট্রবিজ্ঞানের প্রিলিমিনারিতেও ভর্তি হয়েছিলেন। কেউ বলেছেন, ক্যাম্পাসের বাস্তবতা এতটাই ভয়াবহ ছিল যে নিয়মিত উপস্থিতি প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। এসব বর্ণনা একত্রে একটি বৃহত্তর ছবি আঁকে একজন ছাত্রের জীবন, যিনি পড়াশোনা করতে চেয়েছিলেন, কিন্তু সময় তাঁকে সুযোগ দেয়নি।

এখন প্রশ্ন হলো, আমরা কি এই গল্পটিকে মানবিকভাবে দেখব, নাকি রাজনৈতিক কুৎসার চশমা পরে? একজন মানুষ শুধু একটি অসমাপ্ত ডিগ্রির সমষ্টি নন। তাঁর চরিত্র, আচরণ, সময়ের সঙ্গে লড়াই, আত্মসংযম, এবং ভবিষ্যতের পথচলা সব মিলিয়েই একটি জীবন। তারেক রহমানের শিক্ষাজীবন নিয়ে কথা বলতে হলে এই সমগ্রতাটুকু দেখতে হবে। শুধু ব্যঙ্গ করে, ফেসবুকের বিদ্রূপে, কিংবা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হেয়প্রতিপন্নতায় সত্য প্রতিষ্ঠিত হয় না।

আরও গভীরভাবে দেখলে, এই বিতর্ক বাংলাদেশের রাজনীতির নৈতিক সংকটও উন্মোচন করে। আমরা কি সত্যিই ব্যক্তিকে তাঁর প্রাপ্য জায়গা দিতে পারি? না কি সবকিছু দলীয় পরিচয় দিয়ে মাপি? একজন নেতা কোথায় পড়েছেন, কোথায় শেষ করেছেন তা জানার অধিকার অবশ্যই জনগণের আছে। কিন্তু সেই জানার অধিকারকে অপমানের লাইসেন্স বানানো চলে না। সত্যের অনুসন্ধান আর চরিত্রহনন এক জিনিস নয়।

তারেক রহমানের বিশ্ববিদ্যালয় জীবন, অসম্পূর্ণ হলেও, ঢাবির ইতিহাসের বাইরে নয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, সহপাঠী, নথি সবই বলছে, তিনি সেখানে ছিলেন। কিন্তু তাঁর শিক্ষা শেষ না হওয়া যদি রাজনৈতিক বাস্তবতার ফল হয়, তাহলে সেটি আমাদের রাষ্ট্রের ব্যর্থতার কথাও বলে। আমরা অনেকেই ব্যক্তিকে দোষ দিই, কিন্তু কাঠামোকে দায় দিই না। অথচ সত্যিটা হলো, অনেক সময় কাঠামোই মানুষকে অর্ধপথে থামিয়ে দেয়।

এই কারণেই তারেক রহমানের শিক্ষাজীবন নিয়ে আলোচনাটা শুধু ব্যক্তিগত ইতিহাস নয়; এটি একটি সময়, একটি রাষ্ট্র, এবং একটি রাজনৈতিক সংস্কৃতিরও পাঠ। সেখানে আছে ছাত্রের অস্থিরতা, শিক্ষকের স্মৃতি, ক্যাম্পাসের ভয়, এবং পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক বিদ্রূপের নির্লজ্জতা। এ গল্পে যদি কিছু শেখার থাকে, তা হলো অসম্পূর্ণ শিক্ষাজীবনকে নিয়ে হাসাহাসি করার আগে সেই সময়ের নির্মমতাকে দেখা উচিত।

সবশেষে বলা যায়, তারেক রহমানের শিক্ষাজীবন নিয়ে বিতর্ক থাকতেই পারে, প্রশ্ন থাকতেই পারে। কিন্তু প্রশ্ন যেন সত্যের শত্রু না হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের স্মৃতি, শিক্ষকের বয়ান, সহপাঠীর সাক্ষ্য সব মিলিয়ে যে বাস্তবতা উঠে আসে, সেটিকে অবজ্ঞা করা বুদ্ধিবৃত্তিক সততা নয়। একজন মানুষের জীবনকে বুঝতে হলে তাঁর হারানো সময়টিও দেখতে হয়। আর হয়তো সেখানেই তারেক রহমানের ছাত্রজীবনের সবচেয়ে বড় সত্য লুকিয়ে আছে তিনি ছিলেন, তিনি শিখতে চেয়েছিলেন, কিন্তু সময় তাঁকে সম্পূর্ণ হতে দেয়নি।  

লেখক: গণমাধ্যমকর্মী

ডিজিএন/এফএ

banner
Link copied!