ঢাকা সোমবার, ২৫ মে, ২০২৬, ১০ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
Daily Global News

একটি শিশুর মৃত্যু, একটি সমাজের পরাজয়

ওমর ফারুক

প্রকাশিত: মে ২৩, ২০২৬, ০৯:২৩ এএম

একটি শিশুর মৃত্যু, একটি সমাজের পরাজয়

রামিসার মৃত্যু শুধু একটি দুঃখজনক ঘটনা নয়; এটি আমাদের সমাজের মুখে জোরালো এক চপেটাঘাত। একটি শিশু, যার পৃথিবী হওয়ার কথা ছিল হাসি, নিরাপত্তা আর ভালোবাসায় ভরা, সেই শিশুর জীবন যদি এমন নিষ্ঠুরতার শিকার হয়, তাহলে আমরা কোন সভ্যতার গল্প শোনাচ্ছি? রামিসা আজ আর কেবল একজন ছোট্ট মেয়ে নয়; সে হয়ে উঠেছে আমাদের ব্যর্থতার নাম, আমাদের নিষ্ঠুর নীরবতার প্রতীক, আর আমাদের বিবেকের সামনে জ্বলন্ত এক প্রশ্নচিহ্ন।

একটি শিশুর মৃত্যুতে স্বাভাবিকভাবেই মানুষের বুক ফেটে যায়। কিন্তু রামিসার ঘটনায় সেই শোকের সঙ্গে মিশে আছে ঘৃণা, ক্ষোভ আর গভীর এক লজ্জা। কারণ, এই মৃত্যু কেবল একজন অপরাধীর হাতে ঘটেনি-এ মৃত্যু ঘটেছে সেই সমাজের ভেতরে, যেখানে শিশুর কান্না শোনা হয়, কিন্তু তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয় না; যেখানে ন্যায়বিচারের বুলি শোনা যায়, কিন্তু বিচারহীনতার দীর্ঘ ছায়া দিনের পর দিন মানুষকে অভ্যস্ত করে তোলে; যেখানে আমরা প্রতিটি ঘটনার পর ক্ষণিকের আবেগে ফেটে পড়ি, কিন্তু স্থায়ী প্রতিরোধ গড়ে তুলি না।

রামিসার মৃত্যু আমাদের মনে করিয়ে দেয়, শিশুদের প্রতি সহিংসতা কোনো বিচ্ছিন্ন দৈনন্দিন দুর্ঘটনা নয়। এটি এক ভয়ঙ্কর সামাজিক রোগ, যা নীরবতার সুযোগে বেড়ে ওঠে। যখন পরিবার নিরাপদ নয়, পাড়া নিরাপদ নয়, স্কুল নিরাপদ নয়, তখন রাষ্ট্রের “উন্নয়ন” শব্দটি কাগজে ঝলমল করা একটি খালি বাক্যে পরিণত হয়। শিশু যদি নিজের ঘরে, নিজের চেনা পরিবেশে, নিজের সবচেয়ে স্বাভাবিক আশ্রয়ে নিরাপদ না থাকে, তবে রাষ্ট্রের নিরাপত্তা কাঠামো কতটা ভঙ্গুর তা আর নতুন করে ব্যাখ্যা করার প্রয়োজন হয় না।

এখানে সবচেয়ে বেদনাদায়ক সত্যটি হলো, আমরা প্রায়শই এমন ঘটনাকে “অমানবিক” বলে ক্ষণিকের নিন্দা জানাই, কিন্তু অমানবিকতার শিকড় কেটে ফেলতে এগোই না। অপরাধীর শাস্তি হবে এটা যেমন জরুরি, তেমনি জরুরি হলো সেই পরিবেশ ধ্বংস করা, যা অপরাধকে সাহস জোগায়। দৃষ্টান্তমূলক বিচার ছাড়া সমাজকে শিখানো যায় না যে শিশুদের গায়ে হাত তোলা মানে কেবল একটি মানুষের ক্ষতি নয়, পুরো জাতির নৈতিকতা ধ্বংস করা। রামিসার জন্য যদি সত্যিকারের শ্রদ্ধা জানাতে হয়, তবে তা হবে দ্রুত, নিরপেক্ষ, কঠোর বিচার। কারণ বিচারহীনতা কেবল অপরাধীকে নয়, ভবিষ্যতের অপরাধীকেও উৎসাহ দেয়।

আমাদের সমাজে একটি অস্বস্তিকর অভ্যাস গড়ে উঠেছে সংবাদ দেখি, ক্ষুব্ধ হই, দু-একদিন কথা বলি, তারপর নীরব হয়ে যাই। কিন্তু রামিসার মতো একটি শিশুর মৃত্যু কোনো স্বাভাবিক সংবাদ হতে পারে না। এ ধরনের মৃত্যু প্রতিটি মা-বাবার বুক কাঁপানোর কথা, প্রতিটি শিক্ষকের বিবেক নড়ানোর কথা, প্রতিটি প্রশাসনিক কর্মকর্তাকে তাড়িত করার কথা, প্রতিটি নাগরিককে রাস্তায় নামতে বাধ্য করার কথা। যদি আমরা এখনও কেবল সংবাদপত্রের শিরোনামে ক্ষোভ খুঁজে ফিরে আবার আগের জীবনে ঢুকে পড়ি, তবে আমাদের নৈতিক অক্ষমতাও এই হত্যার অংশ হয়ে থাকবে।

রামিসার মৃত্যু আমাদের আরেকটি কঠিন সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করায় শিশু সুরক্ষা আমাদের দেশে এখনও কোনো বাস্তব অগ্রাধিকার নয়, বরং এক ধরনের আনুষ্ঠানিক উচ্চারণ। সভা হয়, বিবৃতি আসে, প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়; কিন্তু শিশুরা নিরাপদ থাকে না। এই ব্যর্থতা প্রশাসনিক নয় কেবল, এটি নৈতিক। কারণ শিশুদের নিরাপদ রাখা রাষ্ট্রের সবচেয়ে মৌলিক দায়িত্বগুলোর একটি। যে রাষ্ট্র শিশুদের রক্ষা করতে পারে না, সে রাষ্ট্র নাগরিককে আশ্বস্ত করতে পারে না। আর যে সমাজ তার সবচেয়ে দুর্বল সদস্যকে বাঁচাতে ব্যর্থ, সে সমাজ নিজের সভ্যতার দাবি নিয়ে কতটা গর্ব করতে পারে?

রামিসার মৃত্যুতে ক্ষোভের পাশাপাশি থাকা উচিত একটি স্থায়ী সংকল্প। এই সংকল্পই পারে আমাদের সমাজকে বদলাতে। পরিবারকে আরও সতর্ক হতে হবে, প্রতিবেশীকে আরও দায়িত্বশীল হতে হবে, বিদ্যালয়কে আরও সুরক্ষিত হতে হবে, আর প্রশাসনকে আরও নির্ভীক হতে হবে। কিন্তু সবকিছুর ওপরে দরকার একটি নৈতিক জাগরণ-যেখানে শিশুর নিরাপত্তা আর আপসের বিষয় থাকবে না, যেখানে সন্দেহভাজন নিরবতা আর চলবে না, যেখানে অন্যায়ের মুখে সমাজ চুপ করে থাকবে না।

রামিসার জন্য কান্না নয়, দরকার বিচার। বিচারই হবে তার প্রতি প্রথম শ্রদ্ধা, আর ন্যায়ের প্রতিষ্ঠাই হবে তার স্মৃতির প্রতি সত্যিকারের সম্মান। যদি এই মৃত্যু আমাদের না জাগায়, তবে আমাদের ভেতরে কিছু একটা চিরতরে মরে গেছে আর সেটি কোনো শিশুর নয়, আমাদের মানবিকতার।

লেখক: গণমাধ্যমকর্মী

ডিজিএন/এফএ

banner
Link copied!