আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটের আকার ধরা হচ্ছে ৯ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা চলতি বছরের তুলনায় ১ লাখ ৪০ হাজার কোটি বেশি। সংসদে এটি পেশ করা হবে ১১ জুন, ঈদের পর। অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী পেশ করবেন তাঁর প্রথম বাজেট। নতুন সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারে প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন, ‘সৃজনশীল অর্থনীতি’র মূলধারায় অন্তর্ভুক্তি এসবই বাজেটের মূল মন্ত্র বলে জানা গেছে ।
প্রত্যাশা অনেক। কারণ গত সাড়ে ষোল বছর একটানা স্বৈরশাসনের কবল থেকে মুক্ত হয়ে প্রথমবারের মতো গণতান্ত্রিক সরকারের হাতে বাজেট প্রণীত হচ্ছে। জনমনে আশা-স্বচ্ছতা, ন্যায়বিচার, সাধারণ মানুষের কল্যাণে বাজেট হবে। কিন্তু প্রত্যাশা আর বাস্তবতার ব্যবধান কতটা, তা দেখা যাবে বাজেটের খাতা ও সংখ্যায়।
আয় লক্ষ্যমাত্রা ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা, ঘাটতি ২ লাখ ৩৫ হাজার কোটি। সুদ পরিশোধে ব্যয় ধরা হতে পারে দেড় লাখ কোটি টাকা একটি বিশাল অংক, যা অন্যান্য খাত থেকে সম্পদ সরিয়ে নেয়। ভর্তুকি খাতে (বিদ্যুৎ, এলএনজি, সার, খাদ্য) ১ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা রাখা হতে পারে। এডিপি আকার তিন লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাচ্ছে, প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ৬-৬.৫ শতাংশ, মূল্যস্ফীতি ৭-৭.৫ শতাংশ ।
কিন্তু প্রশ্ন রাখি- এই সংখ্যা কি সাধারণ মানুষের হাতের নাগালে পৌঁছাবে? সামাজিক ভাতা ও উপকারভোগী বৃদ্ধির ঘোষণা আসবে বলে জানা গেছে এটি স্বাগতম। কিন্তু প্রকৃত চ্যালেঞ্জ হলো- সেই ভাতা কারা পাবে, কী মানদণ্ডে, কতটা স্বচ্ছতায়। অতীতের অভিজ্ঞতা বলে, ভাতা প্রায়শই রাজনৈতিক-প্রশাসনিক স্বার্থে বিতরণ হয়, প্রয়োজনের চেয়ে বেশি। বাজেটে যদি ভাতার মানদণ্ড, তালিকা ও মূল্যায়ন স্বচ্ছ না হয়, তবে তা জনগণের নাগালের বাইরে থেকে যাবে।
কর ও শুল্ক কাঠামো: অর্থ বিভাগ প্রাক-বাজেট আলোচনায় অংশীজনদের মতামত নিচ্ছে এটি ইতিবাচক। কিন্তু করের বোঝা যেন মধ্যবিত্ত ও শ্রমিক শ্রেণির ওপর না পড়ে, বড় করদাতাদের ওপর জোর দেওয়া হয় এমন নীতি বাজেটে প্রতিফলিত হওয়া দরকার। বর্তমানে প্রায় ১০০ কোটি মানুষের মধ্যে মাত্র কয়েক লাখ মানুষ আয়কর দেয়। বাজেট যদি এই কাঠামো বদলায় বড় করদাতা, ভূমি মালিক, বড় কর্পোরেটের ওপর কর বাড়ায় তবেই তা ‘সৃজনশীল অর্থনীতি’র অংশ হবে।
কর্মসংস্থান ও দক্ষতা: প্রবৃদ্ধি ৬-৬.৫ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রা ভালো, কিন্তু তা কি কাজের সৃষ্টি করবে? কারিগরি শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন এবং উদ্যোক্তাদের জন্য ঋণ ও ট্রেইনিং এসব খাতে বাজেটের অংশ যথেষ্ট হতে হবে। নইলে প্রবৃদ্ধি হবে কাগজে, বাস্তবে বেকারত্ব বাড়বে।
শ্রমিক ও কৃষক: ভর্তুকি, সার, খাদ্য-এসব খাতে অর্থ বরাদ্দ আছে, কিন্তু কৃষক ও শ্রমিকের প্রত্যক্ষ উপকার আসবে কি না, তা নির্ভর করছে বাস্তবায়ন। সারের দাম, খাদ্যের দাম, শ্রমিকের মজুরি-এসব বাজেটে কীভাবে প্রতিফলিত হবে, তা দেখতে হবে। কৃষক যদি সারের দাম কম পায়, শ্রমিক যদি মজুরি বাড়ে তবেই বাজেট সাধারণ মানুষের হয়ে বলতে পারব।
স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি: বাজেট প্রণয়ন প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা হয়েছে বলে জানা গেছে। কিন্তু বাজেটের পর বাস্তবায়ন কতটা স্বচ্ছ, তাও দেখা দরকার। জনগণের অধিকার-বাজেটের তথ্য পাওয়া, বাস্তবায়ন পর্যবেক্ষণ, অভিযোগ প্রক্রিয়া এসব নিশ্চিত করতে হবে।
সবশেষে, বাজেট ছাড়াও রাজনৈতিক ইচ্ছা প্রয়োজন। সংখ্যাগুলো শুধু কাগজে থাকবে না, মানুষের হাতে পৌঁছাবে এটা নিশ্চিত করতে রাজনৈতিক সংকল্প ও প্রশাসনিক শৃঙ্খলা দরকার। বাজেট হবে প্রত্যাশা পূরণের নাকি শুধু প্রতিশ্রুতির কথোপকথন তা নির্ভর করছে আমাদের চাপ, আমাদের দাবি, আমাদের অংশগ্রহণের ওপর।
আসুন, আমরা বাজেটকে শুধু সংখ্যার খেলা না দেখি। এটি আমাদের ভবিষ্যৎ, আমাদের হাতের নাগালে। এবারের বাজেট যদি সাধারণ মানুষের হয়ে বাস্তব কাজ করে, তবেই আমরা বলতে পারব এটি সৃজনশীল অর্থনীতির প্রথম পদক্ষেপ, নতুন বাংলাদেশের প্রথম আলো।
লেখক: গণমাধ্যমকর্মী।


আপনার মতামত লিখুন :