ঢাকা সোমবার, ২৫ মে, ২০২৬, ১০ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
Daily Global News

সীমান্তের নীরব গুলি, রাষ্ট্রীয় দায়বাধিতার সংকেত

ওমর ফারুক

প্রকাশিত: মে ২১, ২০২৬, ০১:৩০ পিএম

সীমান্তের নীরব গুলি, রাষ্ট্রীয় দায়বাধিতার সংকেত

সোনারহাটের হেলাল উদ্দীন বলছিলেন, “আমরা এখনো ভয়ে ভয়ে আছি, যদি আবার গোলাগুলি শুরু হয়ে যায়।” এই বাক্যটা শুধু ব্যক্তিগত আবেগ নয়; তা হলো সীমান্তবাসীর জীবন্ত বাস্তবতা। গত সোমবার সিলেটের সোনারহাট সীমান্তে বিএসএফের আকস্মিক গুলিবর্ষণের পর বিজিবি পাল্টা গুলি করে। কেউ হতাহত না হলেও ভয় ও অনিশ্চয়তা ছড়িয়ে পড়েছে এটা কোন দুর্ঘটনা নয়, এটা দীর্ঘদিন ধরে বাল্ক হয়েছে চলমান অনিশ্চয়তারই বহিঃপ্রকাশ।

প্রথমত, পদ্ধতিগত ব্যর্থতা। সীমান্তে গুলির ঘটনা এক-দুইটি বিচ্ছিন্ন ঘটনার মতো দেখা যায় না। গত কয়েক মাসে লালমনিরহাট, ব্রাহ্মণবাড়িয়া সহ নানা জায়গায় বাংলাদেশি নাগরিকদের প্রাণহানি, গুলিবিদ্ধ ও পুশইন-সংকটের খবর এসেছে। মানবাধিকার সংস্থা আসক জানায়, ২০২৫ সালে বিএসএফের গুলিতে অন্তত ২৪ জন নিহত হয়েছেন এবং আরও অনেকে আহত হয়েছেন; এসব ঘটনা সীমান্তে নিয়মিতভাবে ঘটতে থাকা গভীর সমস্যার ইঙ্গিত দেয়। যখন প্রতিবেশীর সীমান্তরক্ষী বাহিনীর হাতে নিয়মিত নাগরিক নিহত হওয়ার কথা আসে, তখন কেবল ঘটনার জন্য “ক্ষমাহীন দোষ” বলা যায় না; এটা একটি কূটনৈতিক, নিরাপত্তাগত এবং মানবাধিকারগত সংকট।

দ্বিতীয়ত, রাষ্ট্রীয় জবাবদিহি ও প্রশ্নবিদ্ধ কূটনীতি। বাংলাদেশের সরকারি পর্যায়ে বারবার ভারতের কাছে অভিযোগ তো করা হয়েছে, কিন্তু প্রতিশ্রুতির সুফল মাঠে দেখা যায়নি এটাই ঘরোয়ায় ক্ষোভ বাড়ায়। বিচার এবং প্রত্যাহারের চাহিদা অনাত্মক হলে সীমান্তবাসীর আত্মরক্ষার অস্তিত্ব প্রশ্নবিদ্ধ হয়। সরকারী কথাবার্তায় যদি ফলস্বরূপ ন্যূনতম কার্যকরী পদক্ষেপ না দেখা যায়, তাহলে আন্তর্জাতিক ফোরামে অভিযোগ তোলা, নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করা এবং প্রয়োজন হলে তৃতীয় পক্ষের মধ্যস্থতা আনা এসব বিকল্পগুলোর কথাই গুরুত্ব পায়। শুধু কূটনীতিক ভাঁজে কথা বললে সীমান্তের মৃত বা আহত পরিবারের ক্ষত কখনো মুচে যাবে না।

তৃতীয়ত, ‘পুশইন’ ও সাম্প্রতিক রাজনীতিক প্রেক্ষাপট। উত্তর-পূর্ব ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির জটিলতা, নির্যাতন আর নাগরিকদের ঝাঁপিয়ে দিয়ে পাঠানোর প্রক্রিয়াগুলো এসবের প্রভাবে সীমান্তবর্তী অঞ্চলগুলোর ওপর চাপ বাড়ে। পশ্চিমবঙ্গের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক অঙ্ক প্রদর্শন বলে দেয় যে সীমানা-নিয়ন্ত্রণ কেবল সীমান্তরক্ষীর কর্মকাণ্ড নয়; তা রাজনৈতিক সংকেতও বহন করে। যখন প্রতিবেশী দেশে বড়ো মাত্রায় পুশইন বা সীমান্ত-ফোর্সের নীতিগত আচরণ দেখা যায়, তখন বাংলাদেশের সীমান্তনীতি শুধুমাত্র প্রতিক্রিয়া নয় এটি প্রস্তুতি, প্রতিরোধ এবং কূটনীতি-উপযোগী কৌশল চায়।

চতুর্থত, মানবিক ও সামাজিক পরিণতি। সীমান্তের মানুষরা এখন মাঠে চাষ করতে যায় না, ক্ষেতে কাজ করে না জীবিকাই ঝুঁকির মুখে। কৃষক, দিনমজুর, স্কুলশিক্ষার্থী সবই প্রভাবিত। সীমান্তশহরগুলোর অর্থনীতিই ধ্বসে পড়তে বসেছে; স্থানীয় প্রশাসনের সতর্কবার্তাও যে পুরোটাই সাময়িক সান্ত্বনা, তা স্পষ্ট। নিরাপত্তা-চিন্তা থাকলে সেখানকার মানুষ তার জীবিকার সঙ্গে ঝুঁকি নেবে না এটি স্বাভাবিক। কিন্তু রাষ্ট্র যদি তাদের জীবন-জীবিকা রক্ষার জন্য স্থায়ী ব্যবস্থা না নেয়, তাহলে সীমান্তকে মানবতাবিহীনভাবে উৎসর্গ করা হচ্ছে।

পঞ্চমত, আমাদের করণীয় দ্বিতীয় কোনো দেরি মেনে নেওয়া যায় না। সরকারের সামনে কয়েকটি অবিলম্বে করণীয় আছে:

অবিলম্বে অভিযুক্ত ঘটনার স্বতন্ত্র, স্বচ্ছ ও আন্তর্জাতিক মান অনুসারে তদন্ত দাবি করা। আহত ও নিহতদের পরিবারকে ন্যায্য ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করা।

সীমান্ত রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে অভিযোগ-প্রমাণ আদানপ্রদান ও দ্রুত বিচারপ্রক্রিয়ায় আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক বা নিরপেক্ষ তৃতীয় পক্ষের অন্তর্ভুক্তি প্রক্রিয়া শুরু করা যাতে পুনরাবৃত্তি রোধ সম্ভব।

সীমান্ত এলাকায় জীবন-জীবিকা নিরাপদ রাখতে স্থানান্তরসহ সাময়িক সুরক্ষা, আর্থিক সহায়তা ও নিরাপত্তা জোরদারের সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা গ্রহণ করা।

কূটনৈতিক চ্যানেলে নিরবিচ্ছিন্ন চাপ রাখা, পরোক্ষ বা প্রত্যক্ষভাবে সীমান্ত হত্যার বিরুদ্ধে নিয়মতান্ত্রিক বিপর্যয় প্রতিরোধে আন্তর্জাতিক ফোরামগুলোকে সক্রিয় করা।

সীমান্ত নেতৃত্বে নিয়মিত স্থানীয় কমিউনিটি-খোলা ফোরাম, যেখানে বিজিবি, পুলিশ ও স্থানীয় প্রশাসন বাসিন্দাদের সঙ্গে নিয়মিত খোলা আলোচনা করবে এবং আগাম সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।

সীমান্তের গুলি কেবল একটি সামরিক ঘটনার নাম না; এটি মানুষের জীবনের ওপর স্থায়ী ক্ষতি করে, সামাজিক আস্থা ভেঙে দেয় এবং রাষ্ট্রীয় দায়বোধকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। যখন আমাদের সীমান্তের মানুষ রাতভর ভয়ে ঘুমায়, কৃষক তার ধানক্ষেতে যেতে দ্বিধা করে, তখন সেটি সরকারের ব্যর্থতার প্রতিফলন। ভোট, কূটনীতি, বা অভিসন্ধির মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়ে এই ক্ষত ঢেকে রাখা যাবে না। এখন সময় সাহসী কূটনীতি, কার্যকর তদন্ত, প্রতিরোধমূলক নিরাপত্তা ও মানবিক সহায়তার নাহলে সীমান্তের নীরব গুলি আমাদের জাতির ন্যায্যতা ও নিরাপত্তাকে চিরতরে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। সূত্র: বিবিসি

লেখক: গণমাধ্যমকর্মী

ডিজিএন/এফএ

banner
Link copied!