ঢাকা শনিবার, ১৩ জুন, ২০২৬, ৩০ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
Daily Global News

দেশে শিশুদের ভিটামিন-এ ক্যাম্পেইন বন্ধ কেন?

ডিজিএন ডেস্ক

প্রকাশিত: জুন ১৩, ২০২৬, ০৯:৪০ এএম

দেশে শিশুদের ভিটামিন-এ ক্যাম্পেইন বন্ধ কেন?

তীব্র ক্যাপসুল সংকটের কারণে দেশে দীর্ঘ ১৪ মাস ধরে শিশুদের জাতীয় ভিটামিন-এ প্লাস ক্যাম্পেইন সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে। সরকারি নিয়মানুযায়ী বছরে দুইবার এই কর্মসূচি পালনের কথা থাকলেও সর্বশেষ এই ক্যাম্পেইন অনুষ্ঠিত হয়েছিল গত বছরের মার্চ মাসে। এরপর গত বছরের সেপ্টেম্বর এবং চলতি বছরের মার্চ মাসের নির্ধারিত দুটি ক্যাম্পেইনই ক্যাপসুল না থাকায় ভেস্তে যায়।

সম্প্রতি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে জানানো হয়েছিল যে আন্তর্জাতিক সংস্থা ইউনিসেফের কাছ থেকে ১০ই জুনের মধ্যে এক কোটির বেশি ভিটামিন-এ ক্যাপসুল পাওয়া যাবে, তবে নির্দিষ্ট সময়ে তা দেশে এসে পৌঁছায়নি। অবশ্য জনস্বাস্থ্য পুষ্টি প্রতিষ্ঠানের পরিচালক ডা. মোহাম্মদ ইউনুস আলী ১০ই জুনের নির্দিষ্ট তারিখের বিষয়টি অস্বীকার করে দাবি করেছেন যে ক্যাম্পেইনটি একেবারে বন্ধ হয়ে যায়নি, বরং জোর চেষ্টা-তদবিরের মাঝেও ক্যাপসুল পেতে কিছুটা বিলম্ব হচ্ছে।

তিনি নতুন আশার বাণী শুনিয়ে জানান, আগামী ১৫ই জুনের মধ্যে কাঙ্ক্ষিত ক্যাপসুলগুলো বিমানে করে দেশে পৌঁছানোর জোর সম্ভাবনা রয়েছে। আর এই প্রাপ্তি সাপেক্ষে আগামী ২৭শে জুনের মধ্যে সারা দেশে শিশুদের ভিটামিন-এ ক্যাপসুল খাওয়ানোর কর্মসূচি শুরু করার সম্ভাব্য তারিখ নির্ধারণ করে মোটামুটি প্রস্তুতি গ্রহণ করছে অধিদপ্তর।

দীর্ঘদিন ধরে এই অতি জরুরি কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ায় দেশের শিশুদের স্বাস্থ্য নিয়ে গভীর উদ্বেগ ও সতর্কবার্তা প্রকাশ করছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।

প্রখ্যাত জনস্বাস্থ্যবিদ ড. মুশতাক হোসেন জানান, এই নিয়মিত ক্যাম্পেইনের সুফলেই বাংলাদেশ থেকে একসময়ের ভয়াবহ রাতকানা রোগটি প্রায় নির্মূল হয়ে গিয়েছিল এবং শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাও বৃদ্ধি পাচ্ছিল। কিন্তু এখন এটি দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকায় শিশুদের মাঝে আবারও রাতকানা, চরম অপুষ্টি এবং হাম সংক্রমণের তীব্র ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। বিশেষ করে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার অভাবে শিশুদের হামের জটিলতা থেকে নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর ঝুঁকি বাড়ে।

উল্লেখ্য, বাংলাদেশে প্রতি বছর ৬ মাস থেকে ৫৯ মাস বয়সী গড়ে প্রায় ২ কোটি ৫৫ লাখ শিশুকে এই ক্যাম্পেইনের আওতায় আনা হয়। এর মধ্যে ৬ থেকে ১১ মাস বয়সী শিশুদের নীল রঙের এবং ১২ থেকে ৫৯ মাস বয়সী শিশুদের লাল রঙের ভিটামিন-এ ক্যাপসুল খাওয়ানো হয়ে থাকে। এবারও ইউনিসেফের কাছে মোট ২ কোটি ৬০ লাখ ক্যাপসুলের চাহিদা পাঠানো হয়েছে।

এবারের নজিরবিহীন ভিটামিন-এ ক্যাপসুল সংকটের পেছনে মূল কারণ হিসেবে সরকারি কেনাকাটার টেন্ডার বা দরপত্র জটিলতাকে দায়ী করা হচ্ছে। জনস্বাস্থ্য পুষ্টি প্রতিষ্ঠান সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪ সালের জুনে স্বাস্থ্য খাতের সর্বশেষ ‘অপারেশনাল প্ল্যান’ শেষ হওয়ার পর নতুন করে টেন্ডার আহ্বান করা হলেও কিছু অভ্যন্তরীণ দ্বিমতের কারণে মন্ত্রণালয় সেটি বাতিল করে দেয়।

পরবর্তীতে মন্ত্রণালয় এবারই প্রথমবারের মতো ইউনিসেফের সাথে একটি বিশেষ চুক্তির মাধ্যমে সরাসরি ‘প্রি-ফাইন্যান্সিং’ পদ্ধতিতে ক্যাপসুল কেনার সিদ্ধান্ত নেয়। এই নতুন সিদ্ধান্তের সুবিধা হলো, বাংলাদেশ এক রাউন্ডের ক্যাপসুল ইউনিসেফ থেকে কিনলে পরবর্তী রাউন্ডের সমপরিমাণ ক্যাপসুল সম্পূর্ণ বিনামূল্যে বা অনুদান হিসেবে পাবে। তবে এই প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে গিয়েই মূলত দীর্ঘ ১৪টি মাস পার হয়ে গেছে, যার খেসারত দিতে হচ্ছে দেশের কোটি কোটি শিশুকে।

সাম্প্রতিক বিভিন্ন জাতীয় জরিপে দেখা গেছে, বাংলাদেশে শিশু ও নারীদের মধ্যে অনুপুষ্টিকণার ঘাটতি আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে এবং দেশের ৬ থেকে ৫৯ মাস বয়সী প্রতি দুজন শিশুর মধ্যে একজনই ভিটামিন-এ’র মারাত্মক ঘাটতিতে ভুগছে।

অথচ শিশুদের দৃষ্টিশক্তি উন্নত করা, রাতকানা রোগ ও রক্তস্বল্পতা প্রতিরোধ, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি এবং ডায়রিয়া বা হামের মতো প্রাণঘাতী সংক্রমণ থেকে রক্ষা করতে ভিটামিন-এ অপরিহার্য ভূমিকা পালন করে। এ কারণে দেশের আইনে ভোজ্যতেলে ভিটামিন-এ মেশানো বাধ্যতামূলক করা হয়েছে এবং এর ব্যতিক্রমে কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডের বিধানও রয়েছে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, শুধু ভিটামিন-এ ক্যাপসুল খাওয়ানোই যথেষ্ট নয়, বরং শিশুদের অপুষ্টির অন্যতম প্রধান কারণ পেটের কৃমি দূর করতে এই ক্যাম্পেইনের পাশাপাশি নিয়মিত কৃমিনাশক ওষুধ খাওয়ানোর কার্যক্রমকেও সমান্তরালভাবে জোরদার করা অত্যন্ত জরুরি। সূত্র: বিবিসি

ডিজিএন/এনএস

banner
Link copied!