নরসিংদীর নাছিমা কাদির মোল্লা হাই স্কুল অ্যান্ড হোমস থেকে চলতি বছর এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেওয়া ৩৮২ জন শিক্ষার্থীর সবাই জিপিএ-৫ পেয়েছে। তবে দশম শ্রেণির মোট ৪৮৫ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে টেস্ট বা নির্বাচনী পরীক্ষায় অনুত্তীর্ণ হওয়ার কারণে ১০৩ জনকে এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়নি। স্কুলের এই অভূতপূর্ব ফলাফল এবং এত বেশিসংখ্যক শিক্ষার্থীকে পরীক্ষায় বসতে না দেওয়ার বিষয়টি সামনে আসার পর প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে ‘নিয়মবহির্ভূত কৌশল’ অবলম্বনের অভিযোগ উঠেছে। এই অভিযোগের ভিত্তিতে স্কুলটির কাছে ব্যাখ্যা চেয়ে একটি শোকজ নোটিশ পাঠিয়েছে ঢাকা মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড।
২০০৮ সালে প্রতিষ্ঠিত এই স্কুলটিতে গত ১৫ বছর ধরে এসএসসি পরীক্ষায় পাসের হার শতভাগ। এর আগে ২০১৫, ২০১৭, ২০২২ ও ২০২৫ সালেও মাধ্যমিক পরীক্ষায় অংশ নেওয়া সব শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ পেয়েছিল। চলতি বছরও সেই ধারা অব্যাহত থাকার পর স্কুলটি ব্যাপক আলোচনায় আসে। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন গণমাধ্যমে অভিযোগ ওঠে যে, জিপিএ-৫ পাওয়ার শতভাগ রেকর্ড ধরে রাখার জন্য এই স্কুল কর্তৃপক্ষ ইচ্ছে করেই অনেক শিক্ষার্থীকে মাধ্যমিক পরীক্ষায় বসতে দেয় না।
এই অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে গত ১৬ আগস্ট শিক্ষা বোর্ডের বিদ্যালয় পরিদর্শক ড. মো. মাসুদ রানা খান স্বাক্ষরিত একটি শোকজ নোটিশ স্কুলটিতে পাঠানো হয়। নোটিশে আগামী সাত কর্মদিবসের মধ্যে ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থীর তথ্য, নবম শ্রেণিতে নিবন্ধিত শিক্ষার্থীর তথ্য, টেস্ট পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারী এবং ফরম পূরণকারী শিক্ষার্থীর তথ্যসহ প্রয়োজনীয় নথিপত্র সশরীরে উপস্থাপন করে অভিযোগের কারণ ব্যাখ্যা করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এ বিষয়ে স্কুলের প্রধান শিক্ষক মো. ইমন আহমেদ গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, তারা শোকজ নোটিশের বিষয়ে অবগত আছেন এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই স্বচ্ছতার সঙ্গে বোর্ডকে এর জবাব দেবেন। ১০৩ জন শিক্ষার্থী টেস্ট পরীক্ষায় অনুত্তীর্ণ হওয়ার কারণেই তাদের ফরম পূরণ করতে দেওয়া হয়নি বলে তিনি দাবি করেন।
তবে স্কুলের প্রাক্তন কয়েকজন শিক্ষার্থী ভিন্ন অভিযোগ তুলেছেন। তাদের দাবি, জিপিএ-৫ পাওয়ার নিশ্চয়তা না থাকলে স্কুল কর্তৃপক্ষ টেস্ট পরীক্ষায় ইচ্ছে করে শিক্ষার্থীদের ফেল করিয়ে দেয়। এক শিক্ষার্থী জানান, টেস্ট পরীক্ষায় মাত্র দুই নম্বরের জন্য তাকে পদার্থবিজ্ঞানে অকৃতকার্য দেখানো হয়। পরে তিনি অন্য স্কুল থেকে পরীক্ষা দিয়ে জিপিএ-৫ পেয়েছেন।
শিক্ষার্থীদের আরও অভিযোগ, টেস্ট পরীক্ষার খাতা বোর্ড স্ট্যান্ডার্ড অনুযায়ী দেখা হয় না। যারা জিপিএ-৫ পাবে না বলে মনে হয়, তাদেরই আটকে দেওয়া হয়। এমনকি জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে বসে পুনরায় পরীক্ষা দিয়ে পাস করার পরও প্রধান শিক্ষক তাদের ফরম পূরণ করতে দেননি বলে অভিযোগ করেন তারা।
এ বিষয়ে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক প্রফেসর ড. পারভেজ সাজ্জাদ চৌধুরী বলেন, বোর্ডের নিয়ম অনুযায়ী টেস্ট পরীক্ষায় পাস করা বাধ্যতামূলক। তবে অনেক প্রতিষ্ঠান নিজেদের ‘সেরা’ হিসেবে প্রমাণের অসুস্থ প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়ে, যারা জিপিএ-৫ পাবে না বলে মনে হয়, তাদের ইচ্ছাকৃতভাবে ফেল দেখিয়ে দেয়।
তিনি এটিকে অনৈতিক চর্চা হিসেবে আখ্যায়িত করে বলেন, যখন কোনো প্রতিষ্ঠানের এত বেশিসংখ্যক শিক্ষার্থী টেস্ট পরীক্ষায় ফেল করে, তখন ওই প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের পাঠদানের মান নিয়েই প্রশ্ন ওঠে। শিক্ষা বোর্ডের নিয়ম অনুযায়ী, কোনো শিক্ষার্থী টেস্ট পরীক্ষায় অকৃতকার্য হলে তাকে পুনরায় (রিটেক) পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ দেওয়ার ক্ষমতা প্রতিষ্ঠানটির হাতে রয়েছে, তবে এই স্কুলটি সেদিকে হাঁটে কি না, তা নিয়ে এখন বড় ধরনের প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।


আপনার মতামত লিখুন :