টুথপেস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিক বা ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণার উপস্থিতি নিয়ে দেশজুড়ে উদ্বেগের মাঝেই এবার নিত্যদিনের অপরিহার্য খাবার দুধ, চিনি ও সয়াবিন তেলেও উচ্চমাত্রায় এই ক্ষতিকর উপাদানের সন্ধান পেয়েছেন গবেষকরা।
সাম্প্রতিক তিনটি পৃথক গবেষণার ফলাফলে দেখা গেছে, মানুষ তার অজান্তেই প্রতিদিন খাবারের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ মাইক্রোপ্লাস্টিক গ্রহণ করছে। গবেষকদের হিসাব অনুযায়ী, শুধু সয়াবিন তেলের মাধ্যমেই একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ প্রতিদিন গড়ে ১৭ দশমিক ৬৫টি এবং বছরে প্রায় ৬ হাজার ৪৪১টি প্লাস্টিক কণা গ্রহণ করছেন।
আর শিশুদের ক্ষেত্রে এই পরিসংখ্যান আরও ভয়াবহ। একজন শিশু প্রতিদিন গড়ে ৭৭ দশমিক ২১টি, অর্থাৎ বছরে প্রায় ২৮ হাজার ১৮০টি মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা গ্রহণ করছে, যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে গভীর শঙ্কার জন্ম দিয়েছে।
যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পুষ্টি ও খাদ্যপ্রযুক্তি বিভাগের অধ্যাপক মো. ওমর ফারুকের নেতৃত্বে একটি গবেষক দল দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে কাঁচা দুধ ও সুপারশপের প্যাকেটজাত দুধ সংগ্রহ করে পরীক্ষা করেছেন।
গবেষণায় দেখা যায়, প্রতি ১০ মিলিলিটার প্রক্রিয়াজাত দুধে গড়ে ১৫৬ দশমিক ০৬টি এবং কাঁচা দুধে গড়ে ৯৩ দশমিক ৩৯টি কণা রয়েছে। খামার থেকে সংগ্রহ করে কারখানায় প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং সবশেষে প্লাস্টিকের প্যাকেটে সংরক্ষণের প্রতিটি ধাপেই দুধ প্লাস্টিকের সংস্পর্শে আসছে।
এছাড়া ঢাকার বাজার থেকে সংগ্রহ করা চিনি নিয়েও একটি আন্তর্জাতিক জার্নালে প্রকাশিত গবেষণায় বলা হয়েছে, ব্র্যান্ডেড চিনির প্রতি কেজিতে গড়ে ৩২২টি এবং খোলা চিনিতে গড়ে ৪০৩টি মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা পাওয়া গেছে।
অন্যদিকে, সয়াবিন তেল নিয়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ও বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালসের যৌথ গবেষণায় জানা গেছে, খোলা সয়াবিন তেলে প্রতি লিটারে গড়ে প্রায় ৪৫ হাজার থেকে ৭০ হাজার এবং বোতলজাত তেলে ৪৪ হাজার থেকে ৫৪ হাজারটি মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা রয়েছে, যা রীতিমতো আঁতকে ওঠার মতো তথ্য।
খাদ্যে মাইক্রোপ্লাস্টিক প্রবেশের তিনটি প্রধান কারণ চিহ্নিত করেছেন বিশেষজ্ঞরা। প্রথমত, প্লাস্টিকের বোতল, প্যাকেট এবং বস্তা থেকে সরাসরি খাবার দূষিত হচ্ছে। দ্বিতীয়ত, কারখানায় প্রক্রিয়াজাতকরণের সময় যন্ত্রপাতির ঘর্ষণে কণা তৈরি হচ্ছে। তৃতীয়ত, পরিবেশে থাকা প্লাস্টিক বর্জ্য ভেঙে পানি, মাটি ও বাতাসে মিশে খাদ্যচক্রে প্রবেশ করছে।
বাংলাদেশে প্রতিদিন প্রায় আট হাজার টন প্লাস্টিক বর্জ্য তৈরি হয়, যার বড় অংশই সঠিক ব্যবস্থাপনার অভাবে পরিবেশে মিশে যাচ্ছে। চিকিৎসাবিজ্ঞানীরা সতর্ক করে বলেছেন, ১৩০ মাইক্রোমিটারের চেয়ে ছোট কণাগুলো সরাসরি মানুষের রক্তে মিশে যেতে সক্ষম, যার ফলে পরিপাকতন্ত্রের জটিলতা, হরমোনের ভারসাম্যহীনতা এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রদাহের মতো মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
এসব চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে আসার পর বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই) সাধারণ মানুষকে আতঙ্কিত না হওয়ার পরামর্শ দিয়েছে।
সংস্থাটি জানিয়েছে, আন্তর্জাতিকভাবে পণ্যে অনিচ্ছাকৃত মাইক্রোপ্লাস্টিকের নির্দিষ্ট কোনো সীমা এখনো নির্ধারিত হয়নি, তবে অভিযোগ ওঠা পণ্যগুলোর বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ ও পর্যালোচনা চলছে। মান পূরণে ব্যর্থ হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণাও দিয়েছে বিএসটিআই।
এদিকে, প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান জানিয়েছেন, সরকার এটিকে কেবল একটি নির্দিষ্ট পণ্যের সমস্যা নয়, বরং একটি বড় বৈশ্বিক জনস্বাস্থ্য সংকট হিসেবে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণের প্রস্তুতি নিচ্ছে।


আপনার মতামত লিখুন :