ঢাকা মঙ্গলবার, ০৩ মার্চ, ২০২৬, ১৯ ফাল্গুন ১৪৩২
Daily Global News

সৌদি আরবে বিদেশিরা এখন মদ কিনতে পারবে !

প্রবাস ডেস্ক

প্রকাশিত: ফেব্রুয়ারি ৬, ২০২৬, ১০:২৫ পিএম

সৌদি আরবে বিদেশিরা এখন মদ কিনতে পারবে !

সৌদি আরবের সামাজিক ইতিহাসে এক উল্লেখযোগ্য মোড় দেখা গেল সম্প্রতি। দীর্ঘ ৭৩ বছর পর রাজধানী রিয়াদে নির্দিষ্ট কিছু বিদেশি বাসিন্দাকে বৈধভাবে অ্যালকোহল কেনার অনুমতি দিয়েছে দেশটির সরকার। এই সিদ্ধান্ত সৌদি আরবের কঠোর মদ নিষেধাজ্ঞার যুগে এক বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে এবং একই সঙ্গে পর্যটন ও বিনিয়োগবান্ধব দেশ হিসেবে নিজেদের নতুনভাবে তুলে ধরার প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

বর্তমানে এই সুবিধা শুধু ধনী ও অমুসলিম বিদেশি বাসিন্দাদের জন্য সীমিত থাকলেও, এটি সৌদি আরবের সামাজিক ও অর্থনৈতিক উদারীকরণের ধারাবাহিক পরিবর্তনের প্রতীক। বিশেষ করে যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের নেতৃত্বে দেশটি যে নতুন পথে হাঁটছে, এই সিদ্ধান্ত তারই একটি স্পষ্ট বার্তা। রিয়াদের ডিপ্লোম্যাটিক কোয়ার্টারে চালু হওয়া একটি বিশেষ দোকান এখন এই পরিবর্তনের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।

১৯৫২ সাল থেকে সৌদি আরবে অ্যালকোহল সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ ছিল। ইসলামী শরিয়াহভিত্তিক আইন অনুযায়ী মদ বিক্রি ও সেবন দীর্ঘদিন ধরেই কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত ছিল, যা আজও সৌদি সমাজের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তবে অর্থনীতিকে আধুনিক করা, বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং বৈশ্বিক পর্যটন মানচিত্রে নিজেদের জায়গা শক্ত করার লক্ষ্য নিয়ে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে একের পর এক নীতিগত পরিবর্তন এনেছে সৌদি সরকার।

সিনেমা হল পুনরায় চালু করা, আন্তর্জাতিক সংগীত উৎসব আয়োজন, নারীদের গাড়ি চালানোর অনুমতি—এ ধরনের পদক্ষেপের ধারাবাহিকতায় ২০২৫ সালে এসে নির্দিষ্ট কিছু বিদেশি বাসিন্দার জন্য অ্যালকোহল কেনার সুযোগ দেওয়া হলো।

অ্যালকোহল বিক্রির এই সিদ্ধান্তটি খুব বেশি প্রচার ছাড়াই কার্যকর করা হয়েছে। রিয়াদের ডিপ্লোম্যাটিক কোয়ার্টারের ভেতরে অবস্থিত একটি চিহ্নহীন দোকানেই কেবল এই পণ্য বিক্রি করা হচ্ছে। দোকানটি প্রথম চালু হয় ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে এবং তখন এটি শুধু অমুসলিম কূটনীতিকদের জন্য সীমাবদ্ধ ছিল। তবে ২০২৫ সালের শেষ দিকে নীতিমালা সম্প্রসারণ করে ধনী বিদেশি বাসিন্দাদেরও এই সুযোগ দেওয়া হয়।

এই সুবিধা পেতে হলে নির্দিষ্ট আর্থিক যোগ্যতা থাকতে হয়। যেমন—প্রিমিয়াম রেসিডেন্সি পারমিট থাকতে হবে, যার বার্ষিক ফি ১ লাখ সৌদি রিয়াল, অথবা মাসিক আয় কমপক্ষে ৫০ হাজার রিয়াল হতে হবে। সাধারণত শীর্ষ পর্যায়ের নির্বাহী, বিনিয়োগকারী ও দক্ষ পেশাজীবীরাই এই শ্রেণিতে পড়েন। তবে মুসলিম নাগরিকদের জন্য অ্যালকোহল নিষিদ্ধই থাকছে।

এই সিদ্ধান্তকে অনেকেই পর্যটন ও প্রবাসী সমাজের জন্য ইতিবাচক বার্তা হিসেবে দেখছেন। যদিও দোকানটির অবস্থান গোপন রাখা হয়েছে এবং মূলত মুখে-মুখেই এর খবর ছড়াচ্ছে, তবুও এটি ইতোমধ্যে রিয়াদের বিদেশি সম্প্রদায়ের মধ্যে বিশেষ আগ্রহের কেন্দ্র হয়ে উঠেছে।

এই বিশেষ দোকানে বিয়ার, ওয়াইন ও বিভিন্ন ধরনের স্পিরিটস পাওয়া যাচ্ছে। তবে দাম আন্তর্জাতিক বাজারের তুলনায় বেশ চড়া। উদাহরণ হিসেবে, জনি ওয়াকার ব্ল্যাক লেবেল হুইস্কির একটি বোতলের দাম প্রায় ১২৪ মার্কিন ডলার। তবুও অনেক প্রবাসী এই দাম দিতে রাজি, কারণ কালোবাজারে এর চেয়েও বেশি দাম গুনতে হয়।

নিরাপত্তা ব্যবস্থা অত্যন্ত কড়া। দোকানে ঢোকার আগে ক্রেতাদের মোবাইল ফোন বিশেষ ব্যাগে সিল করে রাখা হয় এবং নির্ধারিত কোটা অনুযায়ী মাসে সীমিত পরিমাণ অ্যালকোহল কেনার অনুমতি দেওয়া হয়। কূটনীতিকদের জন্য কিছু ক্ষেত্রে ছাড়ও রয়েছে, তবে পুরো অভিজ্ঞতাটিই অত্যন্ত নিয়ন্ত্রিত ও একচেটিয়া।

যদিও এই নীতিমালা আপাতত শুধু বিদেশি বাসিন্দাদের জন্য প্রযোজ্য, তবুও এটি সৌদি আরবের সামাজিক পরিবেশে ধীরে ধীরে পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। বিশেষ করে রিয়াদকে আন্তর্জাতিক ব্যবসা ও সংস্কৃতির কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে নেওয়া উদ্যোগগুলোর সঙ্গে এই সিদ্ধান্ত মিল রেখে চলছে।

রেড সি প্রজেক্ট, নিওম শহরসহ বড় পর্যটন প্রকল্পগুলো ইতোমধ্যেই আন্তর্জাতিক পর্যটকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। আন্তর্জাতিক সংগীত উৎসব, ক্রীড়া ইভেন্ট ও সাংস্কৃতিক আয়োজনের মাধ্যমে সৌদি আরব ধীরে ধীরে নিজেদের নতুন পরিচয় গড়ে তুলছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সিদ্ধান্তের ফলে ধনী প্রবাসীদের আগমন আরও বাড়তে পারে। উন্নত অবকাঠামো, বিলাসবহুল সেবা ও সীমিত হলেও সামাজিক উদারতার ইঙ্গিত সৌদি আরবকে আন্তর্জাতিক পর্যটকদের কাছে আরও আকর্ষণীয় করে তুলতে পারে।

একই সঙ্গে বিলাসবহুল হোটেল, উচ্চমানের রেস্তোরাঁ ও বিনোদন কেন্দ্রের বিস্তার সৌদি পর্যটন শিল্পকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারে। ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতি ও আধুনিক সুযোগ-সুবিধার মিশ্রণ খুঁজছেন—এমন ভ্রমণকারীদের জন্য সৌদি আরব ধীরে ধীরে একটি নতুন গন্তব্য হিসেবে উঠে আসছে।

সব মিলিয়ে বলা যায়, অ্যালকোহল নীতিতে এই পরিবর্তন শুধু একটি নিয়ম শিথিল করার ঘটনা নয়; এটি সৌদি আরবের বৃহত্তর সামাজিক ও পর্যটন রূপান্তরেরই একটি অংশ। দ্রুত বদলে যাওয়া এই দেশটি এখন বিশ্ব পর্যটনের মানচিত্রে নতুনভাবে নিজের জায়গা করে নেওয়ার পথে।

ডেইলি গ্লোবাল নিউজ

banner
Link copied!