ঢাকা শনিবার, ৩০ মে, ২০২৬, ১৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
Daily Global News
কী আছে এই ঐতিহাসিক সমঝোতায়?

ওয়াশিংটন-তেহরান ৬০ দিনের খসড়া চুক্তি চূড়ান্ত, ট্রাম্পের সইয়ের অপেক্ষা

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: মে ২৯, ২০২৬, ০৮:৪৯ এএম

ওয়াশিংটন-তেহরান ৬০ দিনের খসড়া চুক্তি চূড়ান্ত, ট্রাম্পের সইয়ের অপেক্ষা

মধ্যপ্রাচ্যের চলমান রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ পরিস্থিতি ও পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের সামরিক অচলাবস্থা নিরসনে অবশেষে একটি ঐতিহাসিক সমঝোতায় পৌঁছেছেন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের শীর্ষ আলোচকরা। দুই পক্ষই চলমান যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বৃদ্ধি এবং ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে আনুষ্ঠানিক সংলাপ শুরু করার জন্য ৬০ দিনের একটি ‘সমঝোতা স্মারক’-এর খসড়া চূড়ান্ত করেছে।

তবে মার্কিন সংবাদমাধ্যম ‘অ্যাক্সিওস’-কে দুজন মার্কিন কর্মকর্তা ও মধ্যস্থতা প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত আঞ্চলিক একটি গুরুত্বপূর্ণ সূত্র নিশ্চিত করেছে যে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এখনও এই চুক্তিতে তার চূড়ান্ত অনুমোদন দেননি। অন্যদিকে ইরানও এখন পর্যন্ত এই সমঝোতা চুক্তিটি মেনে নেওয়ার বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেনি।

কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই সমঝোতা স্মারকটি যদি উভয় দেশের শীর্ষ নেতৃত্বের সবুজ সংকেত পেয়ে চূড়ান্তভাবে স্বাক্ষরিত হয়, তবে তা হবে মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে সবচেয়ে বড়, তাৎপর্যপূর্ণ ও নজিরবিহীন কূটনৈতিক অগ্রগতি।

আলোচনার সঙ্গে জড়িত একজন মার্কিন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, “এই ৬০ দিনের চুক্তিটি মূলত স্থায়ী শান্তির মূল টেবিলে সবাইকে এক করার একটি প্রাথমিক পদক্ষেপ। মূল আলোচনার টেবিলেই আমরা বাকি খুঁটিনাটি ও স্থায়ী বিষয়গুলো সমাধান করব।”

মার্কিন কর্মকর্তাদের দাবি, গত মঙ্গলবার নাগাদ এই চুক্তির সমস্ত শর্তাবলি প্রায় চূড়ান্ত হয়ে গিয়েছিল। ইরানি প্রতিনিধিরা পরবর্তীতে ফিরে এসে জানান যে এতে তেহরানের শীর্ষ নেতৃত্বের অনুমোদন রয়েছে এবং তারা স্বাক্ষর করতে প্রস্তুত। তবে মার্কিন আলোচকেরা চূড়ান্ত চুক্তির বিস্তারিত বিবরণ প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে অবহিত করলেও তিনি তাৎক্ষণিকভাবে এতে সই করেননি।

একজন মার্কিন কর্মকর্তা জানান, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প মধ্যস্থতাকারীদের জানিয়েছেন যে বিষয়টি নিয়ে চূড়ান্ত চিন্তা-ভাবনা করার জন্য তার আরও দু-এক দিন সময় প্রয়োজন। এর আগেও যুদ্ধের বিভিন্ন পর্যায়ে ট্রাম্প ও তাঁর উপদেষ্টারা চুক্তির খুব কাছাকাছি পৌঁছেছেন বলে মনে করলেও বারবার আলোচনা স্থবির হয়ে পড়েছিল, ফলে এবারও এক ধরনের স্নায়ুদ্ধ চলছে।

কী আছে এই ৬০ দিনের ঐতিহাসিক খসড়া সমঝোতায়?

মার্কিন কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এই ৬০ দিনের সমঝোতা স্মারকে মূলত ৪টি প্রধান শর্ত অন্তর্ভুক্ত রয়েছে:

হরমুজ প্রণালিতে মুক্ত চলাচল ও মাইন অপসারণ: বিশ্ব বাণিজ্যের প্রধান রুট ‘হরমুজ প্রণালি’ দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল হবে সম্পূর্ণ ‘অবাধ ও উন্মুক্ত’। কোনো ধরনের শুল্ক (টোল) আদায় করা যাবে না এবং কোনো জাহাজকে হয়রানি করা যাবে না। একই সঙ্গে ইরানকে আগামী ৩০ দিনের মধ্যে এই প্রণালি থেকে তাদের বসানো সমস্ত সামুদ্রিক মাইন অপসারণ করতে হবে।

নৌ-অবরোধ ও নিষেধাজ্ঞা শিথিল: বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের স্বাভাবিকতার সমান্তরালে মার্কিন নৌবাহিনী ইরানের বন্দরগুলোর ওপর থেকে অবরোধ তুলে নেবে। এছাড়া ইরান যাতে বৈশ্বিক বাজারে অবাধে তেল বিক্রি করতে পারে, সে জন্য যুক্তরাষ্ট্র কিছু অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা সাময়িকভাবে শিথিল করবে।

পরমাণু কর্মসূচি ও অবরুদ্ধ তহবিল মুক্ত করা: সমঝোতা স্মারকে ইরানের পরমাণু অস্ত্র তৈরি না করার অঙ্গীকার অন্তর্ভুক্ত থাকবে। এই ৬০ দিনের মধ্যে প্রথম আলোচনা হবে ইরানের কাছে থাকা সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম কীভাবে স্থানান্তর বা ধ্বংস করা যায় এবং ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কীভাবে কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হবে। বিনিময়ে, আলোচনার অংশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর থেকে স্থায়ী নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ব্যাংকে ইরানের ফ্রিজ বা অবরুদ্ধ করে রাখা তহবিল মুক্ত করার বিষয়ে আলোচনা করতে সম্মত হবে।

মানবিক সহায়তা ও আঞ্চলিক শান্তি: ইরান যাতে আন্তর্জাতিক পণ্য ও মানবিক সহায়তা পেতে পারে, সে জন্য একটি বিশেষ কার্যপদ্ধতি নিয়ে আলোচনা করা হবে। এ ছাড়া, এই সমঝোতা স্মারকে লেবাননে ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহর মধ্যকার যুদ্ধ বন্ধের বিষয়টিও উল্লেখ থাকবে।

কূটনৈতিক টেবিলে যখন এই চুক্তিটি চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে, ঠিক তখনই মাঠপর্যায়ে গত ৪৮ ঘণ্টায় হরমুজ প্রণালিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের নৌবাহিনীর মধ্যে দুটি ছোটখাটো সরাসরি সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে, যা পরিস্থিতিকে এখনও অস্থিতিশীল রাখছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন মার্কিন কর্মকর্তা দাবি করেছেন, ইরানের সামনে এখন তাদের ধ্বংসোন্মুখ অর্থনীতিকে সচল করার একটি বড় সুযোগ এসেছে। তিনি বলেন, “ইরানের শাসনব্যবস্থার ভেতরে এমন কিছু বাস্তববাদী মানুষ আছেন, যারা বোঝেন এখন তাদের ভিন্ন পথে হাঁটার সুযোগ তৈরি হয়েছে। ইরান আলোচনায় যত বেশি ছাড় দিতে রাজি হবে, তারা তত বেশি সুবিধা পাবে।”

তবে মার্কিন প্রশাসনের পক্ষ থেকে কঠোর সতর্কবার্তা দিয়ে বলা হয়েছে, ৬০ দিনের এই আলোচনার সময় যদি এটি স্পষ্ট হয় যে ইরান পরমাণু ইস্যুতে তাদের প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে পারছে না বা ছলচাতুরি করছে, তবে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সামনে অর্থনৈতিক ও সামরিক সব পথই খোলা থাকবে। পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে মোতায়েন করা মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের বিষয়টি কেবল একটি চূড়ান্ত ও স্থায়ী চুক্তির ওপরই নির্ভর করছে।

ডিজিএন/এনএস

banner
Link copied!