সপ্তাহজুড়ে চলা দীর্ঘ শান্তি আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার পর মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে আবারও যুদ্ধের কালো মেঘ ঘনীভূত হয়েছে। ভেঙে পড়েছে দুই দেশের মধ্যকার অলিখিত যুদ্ধবিরতি। পারস্য উপসাগরের কৌশলগত প্রবেশদ্বার ‘হরমুজ প্রণালি’তে নতুন করে মার্কিন সামরিক বাহিনীর আকস্মিক "আত্মরক্ষামূলক" হামলার জবাবে বাহরাইন ও কুয়েতে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটি লক্ষ্য করে ঝাঁকে ঝাঁকে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ছুড়েছে ইরান।
আজ বুধবার (৩ জুন) যুক্তরাজ্যের সংবাদমাধ্যম বিবিসি বাংলার এক বিশেষ প্রতিবেদন থেকে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার এই নতুন রক্তক্ষয়ী সংঘাতের তথ্য নিশ্চিত হওয়া গেছে।
ইউএস সেন্ট্রাল কমান্ড বা সেন্টকম জানিয়েছে, তারা হরমুজ প্রণালিতে অবস্থিত ইরানের কৌশলগত ‘কেশম দ্বীপে’ একটি বড় ধরনের সামরিক অভিযান পরিচালনা করেছে। মার্কিন বাহিনীর দাবি, এই হামলাটি ছিল মূলত "মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে ইরানের পরিকল্পিত আক্রমণের প্রতিক্রিয়া"। কেশম দ্বীপে অবস্থিত একটি ইরানি সামরিক গ্রাউন্ড কন্ট্রোল স্টেশন লক্ষ্য করে এই তোলপাড় করা হামলা চালানো হয়।
এদিকে, এই হামলার পরপরই চরম প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে ইরানের এলিট ফোর্স ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ডস কোর (আইআরজিসি)। আইআরজিসি নিশ্চিত করেছে যে, কেশম দ্বীপের দক্ষিণে তাদের একটি যোগাযোগ টাওয়ারে মার্কিন হামলার জবাবে তারা পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের একাধিক দেশে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটি ও হেলিকপ্টার লক্ষ্য করে পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে। আইআরজিসি এক কড়া বিবৃতিতে সতর্ক করে বলেছে, “হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা বিঘ্নিত করার জন্য মার্কিন সামরিক বাহিনীকে চড়া মূল্য দিতে হবে।”
মার্কিন সেন্টকম দাবি করেছে, ইরান সরাসরি কুয়েতে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটির দিকে লক্ষ্য করে দুটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছিল, যা লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে মাঝপথে ভেঙে পড়েছে। এছাড়া বাহরাইনের মার্কিন ঘাঁটির দিকে ধেয়ে আসা ইরানের আরও তিনটি ক্ষেপণাস্ত্র আকাশেই ধ্বংস করেছে মার্কিন আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। এর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক জলসীমায় চলাচলকারী বেসামরিক জাহাজগুলোকে লক্ষ্য করে ইরানের পাঠানো তিনটি আত্মঘাতী ড্রোনও ভূপাতিত করার দাবি করেছে মার্কিন নৌবাহিনী।
গত ১৩ এপ্রিল থেকে ইরানের বন্দরগুলোতে প্রবেশকারী এবং সেখান থেকে বের হওয়া সমস্ত জাহাজের ওপর কঠোর অবরোধ কার্যকর করে আসছে মার্কিন সামরিক বাহিনী। সেন্টকম জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক জলসীমা দিয়ে ইরানের প্রধান তেল টার্মিনাল ‘খারগ দ্বীপ’-এর দিকে যাওয়ার সময় বতসোয়ানার পতাকাবাহী ‘এম/টি লেক্সি’ নামে একটি খালি তেলের ট্যাঙ্কারকে তারা অবরুদ্ধ করে।
২৪ ঘণ্টা ধরে বারবার সতর্কবার্তা দেওয়া সত্ত্বেও জাহাজটির নাবিকরা তা অমান্য করায় মার্কিন যুদ্ধবিমান থেকে জাহাজটির ইঞ্জিন রুম লক্ষ্য করে অত্যন্ত বিধ্বংসী ‘হেলফায়ার’ ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হয়। ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে ট্যাঙ্কারটি সাগরের মাঝেই পুরোপুরি অকার্যকর হয়ে পড়ে। সেন্টকম গতকাল (মঙ্গলবার) এই হামলার একটি ভিডিও ফুটেজও প্রকাশ করেছে। মার্কিন সামরিক বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, অবরোধ শুরু হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত ইরানের মোট ৬টি বাণিজ্যিক জাহাজ অকার্যকর করা হয়েছে এবং ১২২টি জাহাজকে জোরপূর্বক ভিন্ন পথে যেতে বাধ্য করা হয়েছে।
এদিকে, ইরান যুদ্ধ শুরুর পর এই প্রথমবারের মতো মার্কিন কংগ্রেসে প্রকাশ্যে হাজির হয়ে আইনপ্রণেতাদের তোপের মুখে পড়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও। মার্কিন কৌশল নিয়ে আইনপ্রণেতাদের এক উত্তপ্ত প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী স্পষ্ট জানিয়ে দেন যে, হরমুজ প্রণালি পুনরায় উন্মুক্ত করার বিনিময়ে মার্কিন আলোচকরা ইরানকে কোনো ধরনের নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার সহজ প্রস্তাব দেননি।
মার্কো রুবিও বলেন, “এই মুহূর্তে তেহরানের সাথে যা আলোচনা হয়েছে তা হলো, নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার বিষয়টি সম্পূর্ণ শর্তসাপেক্ষ। অর্থাৎ, যে মূল কারণে এই নিষেধাজ্ঞাগুলো আরোপ করা হয়েছিল যা সরাসরি তাদের পারমাণবিক কর্মসূচির সঙ্গে যুক্ত তার চূড়ান্ত নিষ্পত্তির বিনিময়েই কেবল এই নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা সম্ভব।” শুনানির এক পর্যায়ে তীব্র বাকবিতণ্ডার মধ্যে একজন মার্কিন সিনেটরকে উদ্দেশ্য করে পররাষ্ট্রমন্ত্রী রুবিও দৃঢ় কণ্ঠে বলেন, “যুদ্ধ শেষ হয়েছে (নিষেধাজ্ঞা শিথিলের সুযোগ নেই)।”
শান্তি আলোচনা ভেস্তে যাওয়ার পর হরমুজ প্রণালি ও পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন ও ইরানি যুদ্ধজাহাজের এই মুখোমুখি অবস্থান বিশ্বজুড়ে নতুন করে জ্বালানি সংকট ও তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের আশঙ্কা তৈরি করেছে।


আপনার মতামত লিখুন :