করোনাভাইরাস মহামারির পর কর্মজীবনে যে বড় পরিবর্তন এসেছে, তার অন্যতম হলো ‘ওয়ার্ক ফ্রম হোম’। করোনাভাইরাস মহামারির শুরুতে এটি ছিল জরুরি বিকল্প, তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অনেক প্রতিষ্ঠানের জন্য এটি স্থায়ী কর্মপদ্ধতিতে রূপ নিয়েছে। একদিকে যেমন ঘরে বসে কাজ করার ফলে যাতায়াতের সময় ও খরচ কমেছে, পরিবারকে বেশি সময় দেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে, অন্যদিকে এই ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কিছু নতুন শারীরিক ও মানসিক সমস্যাও।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অফিসের পরিবেশে যেখানে নির্দিষ্ট চেয়ার-টেবিল, আলো ও কাজের কাঠামো থাকে, সেখানে ঘরের পরিবেশ সব সময় সেই মানদণ্ড পূরণ করে না। অনেকেই সোফা, বিছানা বা ডাইনিং টেবিলে বসেই দীর্ঘ সময় কাজ করছেন, যা শরীরের জন্য ক্ষতিকর। এর ফলে ধীরে ধীরে কোমর, ঘাড় ও কাঁধের ব্যথা বাড়ছে।
ফিজিওথেরাপিস্টরা জানান, সঠিক চেয়ার ও টেবিল ব্যবহার না করা, দীর্ঘ সময় এক জায়গায় বসে থাকা এবং অনিয়মিত বিরতির অভাবে মেরুদণ্ডে অতিরিক্ত চাপ পড়ছে। এর সঙ্গে যোগ হচ্ছে শরীরচর্চার অভাব। ঘরে বসে কাজ করার কারণে অনেকের দৈনন্দিন হাঁটা-চলার পরিমাণ কমে গেছে, যা পেশী দুর্বলতা ও জয়েন্টের সমস্যার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।
একজন ফিজিওথেরাপিস্ট বলেন,
“অনেকে মনে করেন ঘরে বসে কাজ করলে শরীরের ওপর চাপ কম পড়ে, কিন্তু বাস্তবে উল্টোটা হচ্ছে। ভুল ভঙ্গিতে দীর্ঘ সময় বসে কাজ করলে ভবিষ্যতে স্থায়ী ব্যথা ও জটিলতা তৈরি হতে পারে।”
শুধু শারীরিক সমস্যা নয়, মানসিক দিক থেকেও ওয়ার্ক ফ্রম হোম নানা চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। কাজ ও ব্যক্তিগত জীবনের সীমারেখা ঝাপসা হয়ে যাওয়ায় অনেকেই দীর্ঘ সময় কাজ করছেন, যার ফলে মানসিক চাপ ও ক্লান্তি বাড়ছে। নির্দিষ্ট সময়ের বাইরে কাজ করার প্রবণতা ঘুমের সমস্যা ও বিরক্তি সৃষ্টি করছে বলেও মত দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।
এই পরিস্থিতিতে বিশেষজ্ঞরা কিছু সচেতন অভ্যাস গড়ে তোলার ওপর জোর দিচ্ছেন। তাদের মতে, ঘরে বসে কাজ করলেও অফিসের মতো একটি নির্দিষ্ট ও আরামদায়ক কর্মস্থল তৈরি করা জরুরি। প্রতি ৩০–৪৫ মিনিট পরপর দাঁড়িয়ে হাঁটা, হালকা স্ট্রেচিং করা এবং চোখকে বিশ্রাম দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি প্রতিদিন অন্তত কিছু সময় শরীরচর্চা ও নিয়মিত ঘুমের অভ্যাস বজায় রাখার কথাও বলা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের অভিমত, ওয়ার্ক ফ্রম হোম নিঃসন্দেহে আধুনিক কর্মজীবনের একটি ইতিবাচক দিক। তবে এই ব্যবস্থাকে দীর্ঘমেয়াদে সুস্থ ও কার্যকর রাখতে হলে সঠিক অভ্যাস গড়ে তোলা জরুরি। সচেতন জীবনযাপন ও শরীরের যত্নই পারে ঘরে বসে কাজ করার সুবিধাকে সত্যিকারের সুফলে পরিণত করতে।


আপনার মতামত লিখুন :