চব্বিশের জুলাই বিপ্লব ছিল এক মহাকাব্যিক অভ্যুত্থান, যার প্রতিটি পৃষ্ঠায় মিশে আছে শত শত তরুণের তাজা রক্ত। আবু সাঈদ থেকে মুগ্ধ যাঁদের আত্মত্যাগ আমাদের একটি নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখিয়েছিল। আজ যখন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল থেকে আবু সাঈদ হত্যা ও চানখাঁরপুল গণহত্যার মতো নৃশংস ঘটনার রায় ঘোষিত হচ্ছে, তখন সেই প্রাপ্তির আনন্দ ছাপিয়ে এক গভীর বিষাদ ও শঙ্কা আমাদের আচ্ছন্ন করছে। প্রশ্ন উঠছে, যে বিচারের আকাঙ্ক্ষায় ছাত্র-জনতা বুক পেতে দিয়েছিল বুলেটের সামনে, সেই বিচার কি আজ কোনো অদৃশ্য আপসের চোরাবালিতে পথ হারাচ্ছে?
রায়ের সমান্তরালে সংশয়ের মেঘ: বিগত পাঁচ মাসে ট্রাইব্যুনাল চারটি গুরুত্বপূর্ণ মামলার রায় ঘোষণা করেছে, যেখানে ১৩ জনকে মৃত্যুদণ্ড ও ১০ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে গত ১৬ মার্চ আশুলিয়ায় লাশ পোড়ানোর ঘটনায় সাবেক এমপিসহ ছয়জনের মৃত্যুদণ্ডের ৫৯১ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ রায় বিচার প্রক্রিয়ায় গতির আভাস দিয়েছিল। কিন্তু এই গতির সমান্তরালে আমরা যখন দেখি নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতারা একে একে জামিনে মুক্তি পাচ্ছেন, তখন বিচারপ্রক্রিয়ার চূড়ান্ত লক্ষ্য নিয়ে জনমনে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি হয়। বিপ্লবী যোদ্ধারা একে দেখছেন ‘বিপ্লবের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা’ হিসেবে। কারণ, কারামুক্তির পর খুনিদের দোসরদের ফুল দিয়ে বরণ করার দৃশ্য শহীদ পরিবারের ক্ষতে লবণের ছিটা দেওয়ার মতোই যন্ত্রণাদায়ক।
রদবদল ও স্বচ্ছতার সংকট: বিচারের স্বচ্ছতা নিয়ে খোদ জাতীয় নেতৃত্বের মধ্যেই প্রশ্ন উঠেছে। জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও সংসদ সদস্য নাহিদ ইসলাম উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছেন, বিচার প্রক্রিয়া অস্বচ্ছ মনে হচ্ছে। বিশেষ করে গত ২৩ ফেব্রুয়ারি কোনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা ছাড়াই সফল চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলামের নিয়োগ বাতিল করে মো. আমিনুল ইসলামকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এই পরিবর্তনকে গবেষকরা নেতিবাচকভাবে দেখছেন, কারণ অভিজ্ঞতার অভাব উচ্চপদস্থ অপরাধীদের শাস্তি নিশ্চিতের পথে অন্তরায় হতে পারে। যদিও নতুন চিফ প্রসিকিউটর তদন্তের ফাঁকফোকর সংশোধনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, তবুও জাতিসংঘের নির্যাতনবিরোধী বিশেষ দূত ড. অ্যালিস জিল এডওয়ার্ডসের সেই সতর্কবাণী আজ বড় বেশি প্রাসঙ্গিক গণহত্যার বিচারে সর্বোচ্চ স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করতেই হবে।
মামলা পুনঃযাচাই: ন্যায়বিচার নাকি রক্ষার ঢাল?: সবচেয়ে বড় সংশয়ের মেঘ জমেছে গত ২৩ ফেব্রুয়ারি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের ঘোষণার পর। ৫ আগস্টের পরবর্তী মামলাগুলো পুনঃযাচাইয়ের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এই যুক্তিতে যে, কিছু নিরীহ মানুষ হয়রানির শিকার হচ্ছে। নীতিগতভাবে নিরীহ মানুষকে রক্ষা করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলেও, ভুক্তভোগীদের মনে প্রশ্ন জেগেছে এই ‘যাচাই-বাছাই’ কি আসলে রাজনৈতিক প্রভাবে প্রকৃত অপরাধীদের রেহাই দেওয়ার কোনো কৌশল? গণবিপ্লবী উদ্যোগের প্রতিনিধি আরিফ সোহেলের ভাষায়, রাজনৈতিক প্রভাবে ন্যায়বিচার বাধাগ্রস্ত হতে পারে এবং যারা বড় দলের আনুকূল্য পাবে, তারা হয়তো বেঁচে যাবে।
শহীদের রক্ত ও আমাদের দায়বদ্ধতা: আজ যখন আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ওঠানামা করছে কিংবা উত্তর-পূর্বাঞ্চলে বন্যার আশঙ্কা তীব্র হচ্ছে, তখন রাষ্ট্র হয়তো অনেক কাজে ব্যস্ত। কিন্তু আমাদের ভুলে গেলে চলবে না, এই রাষ্ট্র দাঁড়িয়ে আছে জুলাইয়ের শহীদদের লাশের ওপর। গুমের শিকার হওয়া পরিবারগুলোর আহাজারি এখনও থামেনি। প্রকৌশলী মাসরুর আনোয়ার চৌধুরীর মতো ভুক্তভোগীদের প্রশ্ন জুলাই গণহত্যার আসামিরা কেন জামিন পেয়ে যাচ্ছে? সাক্ষী ও ভুক্তভোগীরা জীবিত থাকতেই যদি অপরাধীরা ফাঁকফোকর দিয়ে বেরিয়ে যায়, তবে তা হবে ইতিহাসের চরমতম ট্র্যাজেডি।
জুলাই বিপ্লবের বিচার কেবল আইনি দস্তাবেজ নয়, এটি একটি জাতির শুদ্ধ হওয়ার অঙ্গীকার। বর্তমানে ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন ২১টি মামলায় ৪৫৭ জন আসামি রয়েছে। এর মধ্যে আওয়ামী লীগের মন্ত্রী-এমপি থেকে শুরু করে পুলিশ ও সামরিক বাহিনীর সদস্যরাও আছেন। তাঁদের বিচার যদি রাজনৈতিক প্রভাবে বা ‘মামলা পুনঃযাচাইয়ের’ নামে নমনীয় হয়ে পড়ে, তবে নতুন বাংলাদেশের ভিত্তি নড়বড়ে হয়ে যাবে। প্রশাসনিক শুদ্ধি অভিযানে ১৭ জন শীর্ষ পুলিশ কর্মকর্তাকে অবসরে পাঠানো প্রশংসনীয়, কিন্তু সেটি যেন কেবল লোকদেখানো না হয়।
শহীদের রক্তের ঋণ কোনো বিনিময় বা আপসে শোধ হয় না। বিপ্লবের শহীদদের রক্ত তখনই সার্থক হবে, যখন প্রতিটি অপরাধী সে যত প্রভাবশালীই হোক না কেন তার প্রাপ্য সাজা পাবে। বাংলার আকাশ থেকে সংশয়ের মেঘ কেটে গিয়ে ন্যায়বিচারের সূর্য উদিত হওয়া এখন সময়ের দাবি। সূত্র: জাতীয় পত্রিকাসমূহ


আপনার মতামত লিখুন :