ঢাকা বুধবার, ১৫ জুলাই, ২০২৬, ৩১ আষাঢ় ১৪৩৩
Daily Global News

হোলি আর্টিজান হামলার এক দশক: বদলানো রাজনীতিতে ক্ষুব্ধ ও হতাশ শহীদ পরিবারগুলো

ডিজিএন ডেস্ক

প্রকাশিত: জুলাই ১, ২০২৬, ১১:৩৩ এএম

হোলি আর্টিজান হামলার এক দশক: বদলানো রাজনীতিতে ক্ষুব্ধ ও হতাশ শহীদ পরিবারগুলো

আজ ১ জুলাই ২০২৬। ঠিক এক দশক আগে ২০১৬ সালের এই দিনে ঢাকার গুলশানের কূটনৈতিক এলাকার হোলি আর্টিজান বেকারিতে স্তব্ধ করে দেওয়া এক রক্তক্ষয়ী জঙ্গি হামলার মুখোমুখি হয়েছিল বাংলাদেশ। দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ সেই সন্ত্রাসী হামলায় ২ জন পুলিশ কর্মকর্তাসহ ২২ জন দেশি-বিদেশি নাগরিককে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। ১০ বছর পর আজ সেই ক্ষত ও শোকের এক দশক পূর্ণ হলো।

হোলি আর্টিজানের সেই বিভীষিকাময় রাতে জঙ্গিরা ৯ জন ইতালীয়, ৭ জন জাপানি, ১ জন ভারতীয় এবং ৩ জন বাংলাদেশিকে হত্যা করে। পরদিন সকালে সেনাবাহিনীর কমান্ডো অভিযান ‘অপারেশন থান্ডারবোল্ট’-এর মাধ্যমে পাঁচ হামলাকারী নিহত হওয়ার পর জিম্মি সংকটের অবসান ঘটে।

আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠন ইসলামিক স্টেট (আইএস) হামলার দায় স্বীকার করলেও তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার তা প্রত্যাখ্যান করে দেশীয় উগ্রবাদী সংগঠন ‘নব্য জেএমবি’-কে এর জন্য দায়ী করেছিল।

২০২৪ সালের ৫ই আগস্ট এক গণ-অভ্যুত্থানের মুখে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর গত দুই বছরে দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, সরকার পতনের পরবর্তী পরিস্থিতিতে দেশের বিভিন্ন কারাগার থেকে জঙ্গি বা উগ্রবাদী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে আটক প্রায় তিন শতাধিক ব্যক্তি জামিনে মুক্তি পেয়েছেন। এর ফলে সম্প্রতি বাংলাদেশে নতুন করে উগ্রবাদী সংগঠনগুলোর তৎপরতা দৃশ্যমান হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

গত দুই বছরে রাজধানী ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থানে কালেমা খচিত কালো পতাকা নিয়ে মিছিল, উগ্রবাদী ঘরানার ব্যানার-পোস্টার টানানো এবং জঙ্গি হামলার আশঙ্কায় পুলিশের বিশেষ নিরাপত্তা জারি নিয়ে নানা মহলে আলোচনা চলছে। তবে দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বিষয়টিকে বড় কোনো হুমকি হিসেবে দেখছে না।

পুলিশের অ্যান্টি টেররিজম ইউনিট (এটিইউ)-এর প্রধান ও অতিরিক্ত আইজিপি মো. রেজাউল করিম বিবিসি বাংলাকে বলেন, “অনলাইন বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে উগ্রপন্থী কিছু তৎপরতা চোখে পড়লেও বাস্তবে আমরা বড় কোনো সক্রিয় সাংগঠনিক তৎপরতা লক্ষ্য করছি না। আগে তাদের যে ধরনের কর্মকাণ্ড দেখা যেত, তা বর্তমানে অনেকাংশেই নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।”

হোলি আর্টিজান হামলার এক দশক পূর্তির দিনে নিহতদের স্মরণে আইনি দীর্ঘসূত্রিতা এবং রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক অবহেলার অভিযোগ তুলে গভীর ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন শহীদদের স্বজনেরা।

হামলা প্রতিহত করতে গিয়ে প্রথম দফায় নিহত হয়েছিলেন পুলিশের সহকারী কমিশনার রবিউল ইসলাম। তাঁর স্মরণে গুলশান থানা সংলগ্ন এলাকায় নির্মিত হয়েছিল ভাস্কর্য ‘দীপ্ত শপথ’। কিন্তু ২০২৪ সালের ৫ই আগস্ট সরকার পতনের দিন উত্তেজিত জনতা ওই ভাস্কর্যটি ভেঙে ফেলে।

শহীদ রবিউল ইসলামের ছোট ভাই শামসুজ্জামান শামস ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “রাষ্ট্রের জন্য এবং পুলিশ বাহিনীর মর্যাদা রক্ষা করতে গিয়ে আমার ভাই জীবন দিলেন। অথচ তাদের সম্মানে তৈরি হওয়া স্মৃতিস্তম্ভটি ভেঙে ফেলা হলো! এমনকি গত বছর সেখানে পুলিশের পক্ষ থেকেও কোনো আনুষ্ঠানিক সম্মাননা জানানো হয়নি।”

একই আক্ষেপ ঝরে পড়ল রবিউলের স্ত্রী উম্মে সালমার কণ্ঠে। ভাইয়ের মৃত্যুর এক মাস পর জন্ম নেওয়া রাইনা এখন ১০ বছরের শিশু। উম্মে সালমা জানান, দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বদলে যাওয়ার পর আগের মতো সেই সম্মান বা মূল্যায়নটুকু শহীদ পরিবারগুলো এখন আর পাচ্ছে না।

হোলি আর্টিজান মামলার বিচারিক প্রক্রিয়া নিয়েও চরম হতাশা প্রকাশ করেছেন নিহতের পরিবারগুলো। হামলার তিন বছর পর ২০১৯ সালের ২৭শে নভেম্বর ঢাকার সন্ত্রাসবিরোধী বিশেষ ট্রাইব্যুনাল সাত আসামিকে মৃত্যুদণ্ড এবং একজনকে খালাস দেন। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তরা হলেন, জাহাঙ্গীর হোসেন ওরফে রাজিব গান্ধী, আসলাম হোসেন, সোহেল মাহফুজ, হাদিসুর রহমান সাগর, রাকিবুল হাসান রিগ্যান, মামুনুর রশিদ রিপন ও শরিফুল ইসলাম খালিদ।

তবে ২০২৩ সালের ১০ অক্টোবর হাইকোর্ট ডেথ রেফারেন্স ও আপিল শুনানি শেষে এক রাষ্ট্রিয় বিস্ময় তৈরি করে সাত আসামির মৃত্যুদণ্ডের সাজা কমিয়ে ‘আমৃত্যু কারাদণ্ড’ প্রদান করেন। সুপ্রিম কোর্টের পূর্ণাঙ্গ রায়ে বলা হয়, আসামিরা সরাসরি ঘটনাস্থলে না থাকলেও ষড়যন্ত্র ও সহায়তার অপরাধে দোষী, তবে ট্রাইব্যুনাল ধারা সঠিকভাবে না বুঝে সর্বোচ্চ সাজা দিয়েছিলেন, যা গ্রহণযোগ্য নয়।

পরবর্তীতে ২০export৫ সালের জুন মাসে আমৃত্যু কারাদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিরা এই রায়ের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে পৃথক ‘লিভ টু আপিল’ দায়ের করেন। মামলাটি বর্তমানে উচ্চ আদালতে বিচারাধীন রয়েছে। দীর্ঘ ১০ বছর পরও মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি না হওয়াকে এক ধরনের বিচারিক দীর্ঘসূত্রিতা হিসেবে দেখছেন ভুক্তভোগী পরিবারগুলো।

গবেষকদের মতে, বাংলাদেশে উগ্রবাদের উত্থান ও তা দমনের বিষয়টিকে বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করেছে। মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক মুহাম্মদ উমর ফারুক বলেন, “আমাদের দেশে যে দল যখন ক্ষমতায় থাকে, তারা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে জঙ্গিবাদকে পুঁজি করে। কখনো তারা বৈশ্বিক ইমেজের কথা চিন্তা করে এটি অস্বীকার করে, আবার কখনো দমনের কৃতিত্ব নিতে একে সামনে আনে।”

অপরাধ বিজ্ঞানী ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক তৌহিদুল হক মনে করেন, ৫ই আগস্টের পর উগ্রপন্থী গোষ্ঠীগুলো তাদের রণকৌশল পরিবর্তন করেছে। কিন্তু সেই তুলনায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি ও শিথিলতার কারণে মূল সমস্যা নির্মূল না হয়ে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।

আজ যেখানে এক দশক আগে রক্তস্নাত হোলি আর্টিজান বেকারি ছিল, সেখানে এখন মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে একটি বহুতল আবাসিক ভবন। বাইরে থেকে দেখে চেনার উপায় নেই কী ভয়াবহ ট্র্যাজেডি ঘটেছিল এখানে। তবে গুলশানের ৭৯ নম্বর সড়কের সেই রাতের ক্ষতচিহ্ন আজও বাংলাদেশের নিরাপত্তা ইতিহাসের এক স্থায়ী ও চিরন্তন সতর্কবার্তা।

ডিজিএন/এনএস

banner
Link copied!