চীনের কুনমিং থেকে মিয়ানমার হয়ে বাংলাদেশ পর্যন্ত একটি নতুন মেগা অর্থনৈতিক করিডোর (বিসিএম) প্রতিষ্ঠার আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব দিয়েছে বেইজিং। সম্প্রতি (২২-২৪ জুন) বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের তিন দিনের ঐতিহাসিক চীন সফরে দেশটির প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং সরাসরি এই প্রস্তাবটি উত্থাপন করেন।
একই সফরে বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের জীবন-জীবিকার সাথে জড়িত ঝুলে থাকা ‘তিস্তা মহাপরিকল্পনা’ বাস্তবায়নেও পূর্ণাঙ্গ কারিগরি ও আর্থিক সহায়তার জোরদার আগ্রহ দেখিয়েছে চীন। ঢাকা এই প্রস্তাবগুলোকে ইতিবাচক ও দেশের অর্থনীতির জন্য ‘গেম চেঞ্জার’ হিসেবে দেখলেও, এই দুটি মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে মিয়ানমার সংকট এবং ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার ত্রিমুখী ভূরাজনৈতিক দ্বন্দ্বকে বিশাল চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন কূটনীতি বিশ্লেষকেরা।
ঢাকায় সরকারি ও কূটনৈতিক সূত্রগুলোর তথ্য অনুযায়ী, প্রস্তাবিত এই করিডোরটি চীনের ইউনান প্রদেশের রাজধানী কুনমিং থেকে শুরু হয়ে মিয়ানমারের মান্দালয়ে যাবে। সেখান থেকে একটি অংশ ইয়াঙ্গন এবং অন্য অংশটি রাখাইন রাজ্যের কিয়াউকপিউ গভীর সমুদ্রবন্দর পর্যন্ত বিস্তৃত হবে। পরবর্তীতে রাখাইন থেকে সড়ক ও রেল নেটওয়ার্কের মাধ্যমে এই সংযোগ সরাসরি বাংলাদেশের কক্সবাজার ও চট্টগ্রামের সঙ্গে যুক্ত হবে।
উল্লেখ্য, এক যুগেরও বেশি সময় আগে ২০১৩ সালে বাংলাদেশ-চীন-ভারত-মিয়ানমারকে নিয়ে ‘বিসিআইএম’ করিডোরের প্রস্তাব করেছিল বেইজিং। কিন্তু ভারতের কৌশলগত আপত্তির কারণে সেই মেগা প্রজেক্টটি আলোর মুখ দেখেনি। এবার ভারতকে বাদ দিয়ে মিয়ানমার ও বাংলাদেশকে যুক্ত করে নতুন এই করিডোরের নকশা করেছে চীন।
কূটনীতি বিশ্লেষকেরা বলছেন, করিডোর বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে প্রধান অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জ হলো মিয়ানমারের বর্তমান চরম অস্থিতিশীলতা। বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী রাখাইন রাজ্যের একটি বড় অংশ এখন জান্তা বাহিনীকে হটিয়ে উগ্রপন্থী ‘আরাকান আর্মি’র নিয়ন্ত্রণে। এছাড়া মিয়ানমার সরকারের নির্যাতনের শিকার হয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া ১২ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গার প্রত্যাবাসন সংকট তো রয়েছেই। এই নিরাপত্তা ও মানবিক সংকটের স্থায়ী সমাধান না করে করিডোরে যুক্ত হওয়া কতটা নিরাপদ হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
তবে সাবেক রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন কবির মনে করেন, সংকট সামলানোর মূল দায়িত্ব চীনকেই নিতে হবে। তিনি বলেন, “মিয়ানমার সংকট সত্ত্বেও চীন যদি দৃঢ় উদ্যোগ নেয় এবং বাংলাদেশ তাতে সাড়া দেয়, তবে এটি সম্ভব। এই করিডোর বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশ বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি চীনের সাথে সরাসরি যুক্ত হওয়ার পাশাপাশি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ১০টি দেশের অর্থনৈতিক জোট ‘আসিয়ান’-এর বাজারেও সরাসরি প্রবেশাধিকার পাবে।”
আঞ্চলিক চ্যালেঞ্জের বাইরেও এই করিডোরকে কেন্দ্র করে বৈশ্বিক পরাশক্তিগুলোর স্নায়ুযুদ্ধ শুরু হতে পারে। বিশ্লেষকদের মতে, ভারতকে এড়িয়ে চীনের এই করিডোরে ঢাকার যুক্ত হওয়া নয়া দিল্লির জন্য ভূরাজনৈতিক চাপ তৈরি করবে।
অন্যদিকে, বৈশ্বিক পরাশক্তি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়াও বাংলাদেশকে মাথায় রাখতে হবে। বিশেষ করে, ২০২৬ সালের সাধারণ নির্বাচনের মাত্র তিন দিন আগে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বাংলাদেশের একটি হাই-প্রোফাইল বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। ওই চুক্তির একটি অন্যতম ও বিতর্কিত শর্ত ছিল বাংলাদেশ তৃতীয় কোনো দেশের (যেমন চীন বা রাশিয়া) সাথে এমন কোনো অর্থনৈতিক বা কৌশলগত চুক্তিতে যেতে পারবে না, যা যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় স্বার্থের পরিপন্থী হয়। ফলে, চীনের এই করিডোরে যুক্ত হলে ওয়াশিংটন ও দিল্লির পক্ষ থেকে তীব্র মনস্তাত্ত্বিক ও কূটনৈতিক প্রতিক্রিয়া আসতে পারে, যা সামলানো হবে বর্তমান সরকারের জন্য বড় পরীক্ষা।
দীর্ঘদিন ধরে ভারতের সাথে তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তি অধরা থাকায় এবং তিস্তা পাড়ের রংপুর, নীলফামারী, গাইবান্ধা ও কুড়িগ্রামের লাখ লাখ মানুষের আকস্মিক বন্যা ও খরাকবলিত ভাগ্য বদলাতে বিএনপি সরকার এই প্রকল্পকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে। ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকার চীনের সহায়তায় সমীক্ষা চালালেও ভারতের আপত্তির কারণে প্রকল্পটি মাঝপথে থামিয়ে দিয়েছিল।
ঢাকায় নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন এক সংবাদ সম্মেলনে স্পষ্ট জানিয়েছেন, “ঢাকার অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতেই উত্তরাঞ্চলের মানুষের জীবন ও জীবিকার স্বার্থে তিস্তার এই বৃহৎ প্রকল্পে চীন এগিয়ে এসেছে। সমীক্ষা, ডিজাইন থেকে শুরু করে অবকাঠামো নির্মাণ সবখানেই চীন যুক্ত হতে আগ্রহী। এর বাইরে অন্য কোনো রাজনৈতিক উদ্দেশ্য আমাদের নেই।”
এই মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা গেলে নদীর নাব্যতা ও গভীরতা বাড়িয়ে বিস্তৃতি কমিয়ে আনা হবে, যার ফলে শত শত একর ভূমি পুনরুদ্ধার হবে, যা গৃহহীনদের পুনর্বাসন ও শিল্পায়নে ব্যবহার করা যাবে।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন এবং প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিনের বক্তব্য অনুযায়ী, এই সফর দুই দেশের ‘দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারিত্ব ও কৌশলগত’ সম্পর্ককে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে।
তবে সাবেক রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন কবিরের মতে, এই স্পর্শকাতর প্রকল্প দুটিকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে বাংলাদেশকে মূলত ত্রিমুখী আন্তর্জাতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা ‘চীন বনাম যুক্তরাষ্ট্র’ এবং ‘চীন বনাম ভারত’ সামলাতে হবে। এই বহুমুখী ভূরাজনৈতিক চাপকে বাংলাদেশ কতটা কূটনৈতিক প্রজ্ঞা ও দূরদর্শিতার সাথে সামলে নিজেদের অর্থনৈতিক স্বার্থে রূপান্তর করতে পারে, তার ওপরই নির্ভর করছে এই করিডোর ও তিস্তা প্রকল্পের ভবিষ্যৎ। সূত্র: বিবিসি


আপনার মতামত লিখুন :