দেশে গত সাড়ে ছয় বছরে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ১৫ হাজার ৭১২ জনের মর্মান্তিক প্রাণহানি ঘটেছে। একই সময়ে এসব দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হয়েছেন আরও ১৪ হাজার ১৪৩ জন। রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের সর্বশেষ এক পরিসংখ্যান প্রতিবেদনে ভয়াবহ এই চিত্র উঠে এসেছে। সংস্থাটি জানিয়েছে, ২০২০ সাল থেকে ২০২৬ সালের জুলাই মাস পর্যন্ত সারা দেশে ১৬ হাজার ৬৫টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় এই বিপুল সংখ্যক মানুষের হতাহতের ঘটনা ঘটে।
দুর্ঘটনার ধরন ও স্থান বিশ্লেষণে দেখা যায়, সর্বোচ্চ ৬ হাজার ৬৮৯টি দুর্ঘটনা ঘটেছে আঞ্চলিক সড়কে। এছাড়া জাতীয় মহাসড়কে ৪ হাজার ৭৭৩টি, শহরের সড়কে ২ হাজার ৬৪৬টি এবং গ্রামীণ সড়কে ১ হাজার ৯৫৭টি দুর্ঘটনা সংঘটিত হয়েছে। এসব দুর্ঘটনার মধ্যে সবচেয়ে বেশি ৬ হাজার ৩১৪টি ঘটেছে ভারী যানবাহনের ধাক্কায়।
এরপরেই রয়েছে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ৫ হাজার ৪৯৭টি এবং মুখোমুখি সংঘর্ষে ৩ হাজার ৫৪৮টি দুর্ঘটনা। দুর্ঘটনার জন্য এককভাবে সবচেয়ে বেশি ৪০ দশমিক ৩৪ শতাংশ ক্ষেত্রে পণ্যবাহী যানবাহন এবং ৩৬ দশমিক ২৯ শতাংশ ক্ষেত্রে স্বয়ং মোটরসাইকেল চালকরা দায়ী। এছাড়া বাস, প্রাইভেটকার, থ্রি-হুইলার, পথচারী এবং রিকশা-সাইকেলের কারণেও দুর্ঘটনার তথ্য উঠে এসেছে এই প্রতিবেদনে।
রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, দেশে নিবন্ধিত মোট মোটরযানের ৭১ শতাংশই মোটরসাইকেল, যার বড় অংশ ব্যবহার করেন কিশোর ও যুবকরা। মোটরসাইকেল উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর চটকদার বিজ্ঞাপন তাদের অতিরিক্ত গতিতে বাইক চালাতে উৎসাহিত করছে, যার ফলে চালকদের পাশাপাশি পথচারীরাও চরম ঝুঁকির মুখে পড়ছেন।
পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় আক্রান্তদের ৫৮ শতাংশেরই বয়স ১৩ থেকে ৩৫ বছরের মধ্যে। চার চাকার যানের তুলনায় মোটরসাইকেল ৩০ গুণ বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হলেও অনুন্নত গণপরিবহন ব্যবস্থা ও অসহনীয় যানজটের কারণে মানুষ এর প্রতি ঝুঁকছে। পাশাপাশি মানসম্পন্ন হেলমেট ব্যবহারে অনীহা, ট্রাফিক আইন না মানা, ভারী যানের চালকদের অসুস্থতা ও বেপরোয়া মনোভাব, দুর্বল সড়ক অবকাঠামো, রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় বেপরোয়া বাইক চালানোর সংস্কৃতি এবং নজরদারির অভাব এসব দুর্ঘটনাকে আরও বাড়িয়ে তুলছে।
সংস্থাটি বলছে, মানসম্পন্ন হেলমেট ব্যবহার করলে মৃত্যুঝুঁকি অন্তত ৪৮ শতাংশ কমানো সম্ভব।
সড়কে এই মৃত্যুর মিছিল থামাতে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ তুলে ধরেছে রোড সেফটি ফাউন্ডেশন। এর মধ্যে মোটরসাইকেলে নিরাপত্তা ও নজরদারি প্রযুক্তির ব্যবহার, মানসম্পন্ন হেলমেট বাধ্যতামূলক করা এবং ট্রাফিক আইনের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
এছাড়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সচেতনতামূলক ক্যাম্পেইন পরিচালনা, বিটিআরসির মাধ্যমে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিরাপত্তামূলক প্রচারণা, মোটরসাইকেলের বিজ্ঞাপনের ভাষাভঙ্গি পরিবর্তন, নিরাপদ সড়ক অবকাঠামো নির্মাণ এবং সর্বোপরি সাধারণ মানুষের যাতায়াতের জন্য সহজ ও সাশ্রয়ী গণপরিবহন চালুর আহ্বান জানিয়েছে সংস্থাটি।


আপনার মতামত লিখুন :