ঢাকা সোমবার, ২৪ আগস্ট, ২০২৬, ৯ ভাদ্র ১৪৩৩
Daily Global News

হরমুজ সংকটের প্রভাব: পানামা খাল ঘিরে নতুন করে যুক্তরাষ্ট্র-চীন উত্তেজনা

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: আগস্ট ২৪, ২০২৬, ১১:৪৯ এএম

হরমুজ সংকটের প্রভাব: পানামা খাল ঘিরে নতুন করে যুক্তরাষ্ট্র-চীন উত্তেজনা

ইরান যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল ব্যাপকভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এর প্রভাব পড়েছে হাজার হাজার মাইল দূরে অবস্থিত পানামা খালেও। আটলান্টিক ও প্রশান্ত মহাসাগরের সংযোগকারী কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই পানামা খাল এখন যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের নতুন উত্তেজনার কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র সতর্ক করেছে যে, খালটিকে ঘিরে চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব বৈশ্বিক বাণিজ্য ও নিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়ে উঠতে পারে। অন্যদিকে, বেইজিং এই দাবি প্রত্যাখ্যান করে অভিযোগ করেছে, জলপথটির ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ বাড়ানোর অজুহাত হিসেবে ওয়াশিংটন এটি ব্যবহার করছে। দুই পরাশক্তির এই উত্তেজনার মাঝে পানামা স্পষ্ট জানিয়েছে, খালটির ওপর তাদের সার্বভৌমত্ব রয়েছে এবং এটি স্থায়ীভাবে নিরপেক্ষ থাকবে।

বিশ্বের বৃহত্তম আন্তর্জাতিক শিপিং সংগঠন বিমকোর তথ্য অনুযায়ী, মে মাসের শেষ নাগাদ পানামা খাল দিয়ে জাহাজ চলাচল আগের বছরের তুলনায় ৮ শতাংশ বেড়ে দৈনিক গড়ে ৩৮টিতে পৌঁছেছে, যা খালটির সর্বোচ্চ সক্ষমতার কাছাকাছি। ইরান যুদ্ধ শুরুর পরবর্তী পাঁচ সপ্তাহে ট্রানজিটের সংখ্যা আগের বছরের তুলনায় ১৬ শতাংশ বাড়ে।

বিশ্বে বাণিজ্য হওয়া তেলের প্রায় পাঁচ ভাগের এক ভাগ হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়। কিন্তু সেখানে সংঘাতের কারণে এশিয়ার ক্রেতারা যুক্তরাষ্ট্রের সরবরাহকারীদের কাছ থেকে জ্বালানি সংগ্রহ বাড়িয়েছে। এসব পণ্য পরিবহনে পানামা খাল ব্যবহার হওয়ায় ট্রানজিটের চাহিদা বহুগুণ বেড়েছে। ফলে অপেক্ষার সময় দীর্ঘ হওয়ার পাশাপাশি দ্রুত পারাপারের জন্য অপারেটরদের নিলামে রেকর্ড পরিমাণ অতিরিক্ত অর্থও গুনতে হচ্ছে।

ডালাসে ইউনিভার্সিটি অব নর্থ টেক্সাসের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক অরল্যান্ডো জে পেরেজ বলেন, হরমুজ মূলত জ্বালানি পরিবহনের সংযোগস্থল, আর পানামা হলো প্রভাবশালী অর্থনীতির সরবরাহ শৃঙ্খলের সংযোগস্থল। যুক্তরাষ্ট্রের কনটেইনার পরিবহনের প্রায় ৪০ শতাংশই এই খাল দিয়ে যায়।

বাড়তি চাপের পাশাপাশি খালটি পরিবেশগত সীমাবদ্ধতারও মুখোমুখি। ৮০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই কৃত্রিম জলপথে লক ব্যবস্থা ব্যবহার করে গাতুন হ্রদের স্বাদু পানির সাহায্যে জাহাজ পারাপার করা হয়। কিন্তু এল নিনোসহ জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে গাতুন হ্রদের পানির স্তর ঐতিহাসিক গড়ের নিচে নেমে গেছে। ফলে পানামা ক্যানাল অথরিটি জাহাজ চলাচলের ওপর সীমাবদ্ধতা আরোপ করতে বাধ্য হয়েছে।

পানামা খালের ওপর বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ না থাকলেও বিবাদের মূল বিষয় হলো প্রভাব বিস্তার। দীর্ঘসময় যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে থাকার পর ১৯৯৯ সালের ৩১ ডিসেম্বর তোরিহোস-কার্টার চুক্তি অনুযায়ী খালটির নিয়ন্ত্রণ পানামার কাছে হস্তান্তর করা হয়।

বর্তমানে হংকংভিত্তিক কোম্পানি সিকে হাচিসন পানামা পোর্টস কোম্পানির মাধ্যমে খালের দুই প্রবেশমুখে বন্দর পরিচালনা করে। খাল পরিচালনায় চীনের কোনো ভূমিকা না থাকলেও বন্দর ও সরবরাহ অবকাঠামোতে চীনের এই উপস্থিতি নিয়ে উদ্বিগ্ন যুক্তরাষ্ট্র। সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও এ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে খালটির নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধারের ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, যা পানামা প্রত্যাখ্যান করে।

অন্যদিকে, চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র লিন জিয়ান যুক্তরাষ্ট্রের এসব অভিযোগকে ‘সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন’ আখ্যা দিয়েছেন। চীনের দাবি, তারা পানামার সার্বভৌমত্ব ও খালের নিরপেক্ষতাকে সম্মান করে। বরং যুক্তরাষ্ট্রই খালটির নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার অজুহাত খুঁজছে বলে অভিযোগ বেইজিংয়ের।

বিশ্লেষকেরা বর্তমান বিরোধকে ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার প্রতিফলন হিসেবে বর্ণনা করছেন। ইউনিভার্সিটি অব চিলির অধ্যাপক হোর্হে হেইনে বলেন, হরমুজ প্রণালিতে সৃষ্ট বিঘ্নের কারণে পানামার ওপর চাপ বেড়েছে এবং এ ইস্যুতেই চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে উত্তেজনা বৃদ্ধি পেয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বড় পরাশক্তিগুলোর এই ভূরাজনৈতিক দ্বন্দ্বের কারণে পানামার মতো ছোট দেশগুলোকেই সবচেয়ে বেশি মাশুল গুনতে হয়। সূত্র: বিবিসি

ডিজিএন/এফএ

banner
Link copied!