ঢাকা মঙ্গলবার, ০৩ মার্চ, ২০২৬, ১৯ ফাল্গুন ১৪৩২
Daily Global News

মরুপ্রান্তর পেরিয়ে সিংহাসনে: বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক ‘ফিনিক্স’ উপাখ্যান

ওমর ফারুক

প্রকাশিত: ফেব্রুয়ারি ১৪, ২০২৬, ১০:০৮ পিএম

মরুপ্রান্তর পেরিয়ে সিংহাসনে: বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক ‘ফিনিক্স’ উপাখ্যান

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ কেবল একটি তারিখ নয়, বরং একটি নতুন যুগের প্রারম্ভ বিন্দু হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। ১৮ বছরের দীর্ঘ রাজনৈতিক শীতনিদ্রা ভেঙে ব্যালট বিপ্লবের মাধ্যমে জনতা যে রায় দিয়েছে, তা যেমন বিস্ময়কর, তেমনি দায়িত্বশীল এক ভবিষ্যতের বার্তাবাহী।


নির্বাচনের ফলাফলে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটের ২১৩ আসনে জয়লাভ এক প্রবল জনসমর্থনেরই বহিঃপ্রকাশ। এই জয় কেবল একটি দলের ক্ষমতায় ফেরা নয়, বরং ভঙ্গুর গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে পুনর্গঠনের একটি ম্যান্ডেট। তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি যেভাবে গত কয়েক বছর ধরে ‘রাষ্ট্র সংস্কারের ৩১ দফা’ নিয়ে মানুষের দ্বারে দ্বারে গেছে, ভোটাররা মূলত সেই আধুনিক ও জবাবদিহিমূলক শাসনব্যবস্থার অনুকূলে সায় দিয়েছেন। তবে এই বিজয়ের সত্যিকারের সার্থকতা নির্ভর করবে প্রতিহিংসামুক্ত রাজনীতি এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার ওপর। তারেক রহমান তাঁর প্রথম সংবাদ সম্মেলনেই যে ‘দুর্বলের ওপর সবলের আঘাত বরদাশত না করার’ হুঙ্কার দিয়েছেন, তা জনমনে স্বস্তি জুগিয়েছে।


এই নির্বাচনের সবচেয়ে চমকপ্রদ দিক হলো জামায়াতে ইসলামীর উত্থান। জোটসহ ৭৭টি আসন নিয়ে তারা এখন সংসদের প্রধান বিরোধী শক্তি। জামায়াত আমিরের ‘নীতিনিষ্ঠ ও শান্তিপূর্ণ’ বিরোধী দল হওয়ার ঘোষণা বাংলাদেশের সংসদীয় গণতন্ত্রে এক নতুন মেরুকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে। অতীতে রাজপথের মিত্র হিসেবে বিএনপি-জামায়াতকে দেখা গেলেও, এখন সংসদের ভেতর তাদের সম্পর্ক হবে ‘সরকার বনাম বিরোধী দল’। এই ভারসাম্য বজায় থাকলে সংসদ হবে প্রাণবন্ত এবং জবাবদিহিমূলক।


নাহিদ ইসলামের নেতৃত্বে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) ৬টি আসনে জয় এবং আরও অনেক আসনে প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তোলা প্রমাণ করে বাংলাদেশের তরুণ সমাজ এখন প্রথাগত রাজনীতির বাইরে বিকল্প এবং আদর্শভিত্তিক নেতৃত্ব খুঁজছে। ছাত্র-জনতার বিপ্লবের চেতনাকে ধারণ করে এই তরুণরা যখন সংসদে কথা বলবেন, তখন রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণে এক নতুন গতির সঞ্চার হবে।


অন্যদিকে, আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টির মতো দলগুলোর এই নির্বাচনী দৃশ্যপট থেকে ছিটকে পড়া আমাদের শিখিয়ে দেয় যে, জনবিচ্ছিন্নতা এবং স্বৈরতান্ত্রিক মানসিকতা কোনো দলকেই চিরস্থায়ী করতে পারে না। সজীব ওয়াজেদ জয়ের সাম্প্রতিক বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, তারা রাজনীতিতে ফেরার পথ খুঁজছে। তবে ফেরার এই পথটি হতে হবে শুদ্ধিকরণ ও জনক্ষমার মাধ্যমে, যা বর্তমান পরিস্থিতিতে বেশ চ্যালেঞ্জিং।


আগামী সোমবারের শপথ গ্রহণের পর যে নতুন মন্ত্রিসভা যাত্রা শুরু করবে, তাদের সামনে পাহাড়সম চ্যালেঞ্জ। ভঙ্গুর অর্থনীতি পুনরুদ্ধার, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক করা হবে তাদের প্রথম অগ্নিপরীক্ষা। বিশেষ করে বগুড়ায় বোনের সম্মান রক্ষায় ফাহিমের মতো তরুণের প্রাণ হারানোর ঘটনা আমাদের মনে করিয়ে দেয় আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা কতটা জরুরি।

বাংলাদেশের মানুষ আর পুরনো বৃত্তে ফিরতে চায় না গণভোটে ৬৮ শতাংশ ‘হ্যাঁ’ ভোট সেটিই প্রমাণ করেছে। ১৬ ফেব্রুয়ারি যে নতুন সূর্যোদয় হতে যাচ্ছে, তা যেন কেবল ক্ষমতার পালাবদল না হয়ে একটি সত্যিকারের ‘মানবিক বাংলাদেশে’র সূচনা হয়। প্রতিহিংসার বিপরীতে যদি সৌজন্যের রাজনীতি (যেমন তারেক রহমানের প্রতিপক্ষের বাসায় যাওয়ার সিদ্ধান্ত) জয়ী হয়, তবেই চব্বিশের বিপ্লবের শহীদের আত্মা শান্তি পাবে।

ওমর ফারুক, গণমাধ্যমকর্মী

ডিজিএন/এফএ

banner
Link copied!