নদীর উত্তাল ঢেউ আর আপনজনের কান্নায় আজ ভারী হয়ে উঠেছে রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া ফেরিঘাট। গত বুধবারের সেই অভিশপ্ত মুহূর্তটি যখন একটি যাত্রীবাহী বাস নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পদ্মা নদীর গভীরে তলিয়ে গেল, তখন থেকেই শুরু হয়েছে এক যন্ত্রণাদায়ক অপেক্ষা। আজ শুক্রবার, দুর্ঘটনার তৃতীয় দিন। এ পর্যন্ত উদ্ধার করা হয়েছে ২৬টি নিথর দেহ। অথচ এই ২৬টি প্রাণের প্রতিটিই ছিল কোনো না কোনো পরিবারের আশার প্রদীপ।
উদ্ধার অভিযানে অংশ নিয়েছে ফায়ার সার্ভিস, নৌবাহিনী এবং কোস্টগার্ডের দক্ষ ডুবুরি দল। একে একে উদ্ধার হওয়া ২৬টি মরদেহের সারি দেখে পাষাণ হৃদয়ের মানুষেরও চোখ ভিজে উঠছে। নিখোঁজ স্বজনদের সন্ধানে নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষের আহাজারি বাতাসের সাথে মিশে এক করুণ সুর তৈরি করেছে। উদ্ধারকারীরা স্পিডবোট নিয়ে মাইলের পর মাইল চষে বেড়াচ্ছেন এই আশায় যদি আরও কাউকে জীবিত অথবা নিথর অবস্থায় খুঁজে পাওয়া যায়। কিন্তু সময় যত গড়াচ্ছে, নিখোঁজদের ফিরে পাওয়ার আশা তত ক্ষীণ হয়ে আসছে।
দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে বাস নদীতে পড়ে যাওয়ার ঘটনা এটিই প্রথম নয়। প্রশ্ন জাগে, দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই নৌ-ঘাটে কেন বারবার এমন দুর্ঘটনা ঘটবে?
# ঘাটের অব্যবস্থাপনা: ফেরিঘাটের পন্টুনগুলোতে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা বেষ্টনী বা `ব্যারিয়ার` না থাকা অন্যতম বড় কারণ
# ফিটনেসবিহীন যান ও চালকের ক্লান্তি: দূরপাল্লার বাসগুলোর যান্ত্রিক ত্রুটি এবং চালকদের দীর্ঘ সময় গাড়ি চালানোর ফলে সৃষ্ট অবসাদ অনেক সময় নিয়ন্ত্রণ হারানোর কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
# বর্ষা ও পিচ্ছিল পথ: বৃষ্টির দিনে পন্টুন ও সংযোগ সড়কগুলো পিচ্ছিল হয়ে যায়, অথচ সেখানে পর্যাপ্ত বালু বা সুরক্ষার ব্যবস্থা থাকে না।
২৬টি প্রাণ এবং একটি রাষ্ট্র : প্রতিটি মৃত্যুর পর তদন্ত কমিটি হয়, ক্ষতিপূরণের আশ্বাস দেওয়া হয়, কিন্তু কাজের কাজ কতটুকু হয়? এই ২৬টি পরিবারের অপূরণীয় ক্ষতি কি কেবল ২৫-৩০ হাজার টাকার চেক দিয়ে মেটানো সম্ভব? যে সন্তান তার বাবাকে হারিয়েছে বা যে মা তার কলিজার টুকরোকে পদ্মার অতলে বিসর্জন দিয়েছে, তাদের কাছে এই ক্ষতিপূরণ স্রেফ একটি সংখ্যা মাত্র।
আমাদের দাবি: দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া নৌরুটে শৃঙ্খলা ফেরাতে হলে কেবল উদ্ধার অভিযান দিয়ে হবে না, প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা। প্রতিটি ঘাটে অটোমেটিক ব্যারিয়ার স্থাপন, চালকদের দক্ষতা যাচাই এবং ঘাটের ইজারাদারদের গাফিলতি বন্ধ করতে হবে।
পদ্মার পানি হয়তো সময়ের সাথে সাথে শুকিয়ে যাবে, কিন্তু স্বজনহারাদের চোখের পানি কখনো শুকাবে না। এই ২৬টি মৃত্যু আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল যে, আমাদের সড়ক ও নৌ-পথ কতটা অনিরাপদ। আমরা আর কোনো `দৌলতদিয়া ট্র্যাজেডি` দেখতে চাই না। রাষ্ট্র ও প্রশাসন কি পারবে আগামী ঈদযাত্রায় আমাদের এক নিরাপদ গন্তব্যের নিশ্চয়তা দিতে?
ওমর ফারুক, গণমাধ্যমকর্মী


আপনার মতামত লিখুন :