রোজার ছুটি আর ঈদের আমেজ কাটিয়ে শিক্ষার্থীরা যখন চিরচেনা শ্রেণিকক্ষে ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছিল, ঠিক তখনই মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি বিশ্বজুড়ে এক নতুন সংকটের জন্ম দিল। জ্বালানি তেলের আকাশচুম্বী দাম আর সরবরাহ সংকটে যখন থমকে যাওয়ার উপক্রম বৈশ্বিক অর্থনীতি, তখন বাংলাদেশের শিক্ষা মন্ত্রণালয় এক সাহসী ও দূরদর্শী প্রস্তাব নিয়ে হাজির হয়েছে `হাইব্রিড ক্লাসরুম`। সপ্তাহে তিন দিন সরাসরি স্কুলে উপস্থিতি আর বাকি তিন দিন ইন্টারনেটের মাধ্যমে ডিজিটাল পাঠদান। এই সিদ্ধান্ত কেবল একটি সাময়িক সমাধান নয়, বরং এটি আমাদের সনাতন শিক্ষাব্যবস্থাকে একবিংশ শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রস্তুত করার এক বড় পরীক্ষা।
মঙ্গলবার সচিবালয়ে শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহসানুল হক মিলনের বক্তব্যে উঠে এসেছে এক রূঢ় বাস্তবতা। তিনি জানিয়েছেন, জ্বালানি সাশ্রয় এবং যানজট নিরসনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বিশেষ নির্দেশনার আলোকেই এই ‘৩ দিন অনলাইন-৩ দিন অফলাইন’ মডেলটি ভাবা হচ্ছে। বিশেষ করে ঢাকা বা চট্টগ্রামের মতো মেগাসিটিগুলোতে স্কুল শুরু ও ছুটির সময়ে যে ভয়াবহ যানজট তৈরি হয়, তাতে কেবল জ্বালানিই নষ্ট হয় না, নষ্ট হয় হাজার হাজার কর্মঘণ্টা। এই নতুন নিয়ম কার্যকর হলে রাস্তায় গাড়ির চাপ অর্ধেক কমে আসবে, যা সরাসরি ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে আমাদের বিপর্যস্ত জ্বালানি খাতের ওপর।
তবে এই হাইব্রিড মডেলের সাফল্যের পেছনে বড় একটি শর্ত হলো `ডিজিটাল সাম্য`। আমরা করোনাকালীন অনলাইন ক্লাসের সময় দেখেছি, শহরের সুবিধাপ্রাপ্ত শিক্ষার্থীরা ল্যাপটপ আর হাই-স্পিড ইন্টারনেটে ক্লাস করতে পারলেও গ্রামের বা নিম্নবিত্ত পরিবারের অনেক শিক্ষার্থী পিছিয়ে পড়েছিল। এবার সেই ভুলের পুনরাবৃত্তি রোধ করতে হবে। সরকার যে ‘জোড়-বিজোড়’ রোল নম্বর বা তারিখ অনুযায়ী গ্রুপ ভাগ করে ক্লাস নেওয়ার কথা ভাবছে, তা বেশ চমৎকার। এতে করে শ্রেণিকক্ষে ভিড় কমবে এবং শিক্ষকরা প্রতিটি শিক্ষার্থীর ওপর বেশি নজর দিতে পারবেন।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো শিক্ষকদের ভূমিকা। প্রস্তাব অনুযায়ী, অনলাইন ক্লাসের দিনগুলোতেও শিক্ষকদের স্কুলে উপস্থিত থাকতে হবে। এতে করে পাঠদানের মান বজায় থাকবে এবং শিক্ষার্থীরা বাড়িতে বসেও স্কুলের আবহের সাথে যুক্ত থাকতে পারবে। তবে বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থীদের জন্য ল্যাবরেটরি বা ব্যবহারিক ক্লাসগুলো সশরীরে রাখার সিদ্ধান্তটি অত্যন্ত যৌক্তিক। কারণ, ভার্চুয়াল রিয়ালিটি দিয়ে কখনোই সত্যিকারের রাসায়নিক বিক্রিয়া বা পদার্থবিজ্ঞানের হাতে-কলমে শিক্ষা পূর্ণাঙ্গ করা সম্ভব নয়।
অবশ্য চ্যালেঞ্জও কম নয়। আমাদের দেশের অনেক এলাকায় এখনো নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও ইন্টারনেটের অভাব রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের প্রভাবে যদি লোডশেডিং বাড়ে, তবে অনলাইন ক্লাসের কার্যকারিতা প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে। এছাড়া দীর্ঘ সময় স্ক্রিনের সামনে বসে থাকা শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর কেমন প্রভাব ফেলবে, সেটিও বিবেচ্য। তাই শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে কেবল একটি রুটিন দিয়েই দায়িত্ব শেষ করলে চলবে না, বরং নিয়মিত তদারকি ও ফিডব্যাক নিতে হবে।
সংকটই অনেক সময় নতুন উদ্ভাবনের জন্ম দেয়। এই হাইব্রিড শিক্ষাক্রম যদি সফলভাবে বাস্তবায়ন করা যায়, তবে বাংলাদেশ কেবল জ্বালানি সাশ্রয়ই করবে না, বরং ডিজিটাল লিটারেসিতে কয়েক ধাপ এগিয়ে যাবে। এটি একটি ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’ গড়ার পথে বড় ধাপ হতে পারে, যেখানে শিক্ষা কেবল চার দেয়ালের মাঝে সীমাবদ্ধ থাকবে না। যুদ্ধের বারুদ আর তেলের অভাব আমাদের থামিয়ে দিতে পারবে না, যদি আমরা প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারি।
আশা করা যায়, আগামী বৃহস্পতিবার মন্ত্রিসভার বৈঠকে এই প্রস্তাবটি অনুমোদনের পর আমাদের শিক্ষার্থীরা এক নতুন অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে জ্ঞানের পথে এগিয়ে যাবে। চক-ডাস্টারের সাদা ধুলো আর স্মার্টফোনের নীল আলো এই দুয়ের সমন্বয়েই রচিত হোক আগামীর সমৃদ্ধ বাংলাদেশ।
ওমর ফারুক, গণমাধ্যমকর্মী।


আপনার মতামত লিখুন :